• সোমবার   ২৩ নভেম্বর ২০২০ ||

  • অগ্রাহায়ণ ৯ ১৪২৭

  • || ০৮ রবিউস সানি ১৪৪২

৬১

হাওরের বুক চিরে সড়ক, অপার সৌন্দর্যে টানছে ভ্রমণপিপাসুদের

আলোকিত সিরাজগঞ্জ

প্রকাশিত: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২০  

জলের সঙ্গে আকাশের মিতালি সেথায়। প্রকৃতির এ জলপাড়ায় জোছনা নামে বেখেয়ালি মনে। জলরাশি আর জোছনার মধু মাখায় এ রূপ যেন ধরে না। ঢেউয়ে ঢেউয়ে রূপের সে কিরণ উপচে পড়ে। হাওর মানেই সৌন্দর্যের আলোকচ্ছটা, যেথায় দিনে সূর্য আর রাতে জোছনার মেলা।

নিকলী হাওর, প্রকৃতির এক রাজকন্যার যেন হাতছানি। দিগন্তহীন জলরাশি। তাতে প্রায় ভেসে থাকা ছোট ছোট গ্রাম, ঠিক যেন সমুদ্রবক্ষে দ্বীপ সমান। হাওরজুড়ে জেলেদের মাছ ধরার নৌকা। হাওরবক্ষ ভেদ করে ছুটে চলা নদী। সে নদীতে অবিরাম ভারী নৌযানের ভেসে চলা। এ জলাধার মোহনীয় এক রূপের আধার।

প্রকৃতির এ রূপ সাগরে নয়া সংযোজন ইটনা-মিঠামইন ও অষ্টগ্রামের পাকা সড়ক। হাওরের বুক চিরে সাপের মতো বয়ে চলা সড়কটিও এখন ভ্রমণপিপাসুদের হাতছানি দিচ্ছে।

হাওরের মাঝে এমন উন্নয়ন নিয়ে বিতর্কও আছে। বিশেষ করে প্রকৃতিপ্রেমীরা চাইবে না প্রাণ-প্রকৃতির অভয়াশ্রমে মানবসৃষ্ট এমন নকশা দাগ কাটুক। এ সড়কটি নিঃসন্দেহে হাওরের স্বাভাবিক গতিপ্রবাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে।

কিন্তু উন্নয়নের তাগিদে প্রকৃতি কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এ সড়কটি এ অঞ্চলের মানুষের জন্য আশার আলোই জ্বালছে। জল, জলযান যাদের জীবনের সারথি, তারা পাকা সড়কে হাঁটবে, তা ছিল স্বপ্নের মতো। অথচ সেই স্বপ্নের সড়কেই আজ হাঁটছেন তারা। এই সড়কই এখন বলে হাওরের উন্নয়নের কথা, বলে সুখের কথা।

সড়ক ও জনপথ বিভাগ এক হাজার ২৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নিকলী হাওরে যে সড়কটি তৈরি করেছে, তা হাওরবাসীর ভাগ্য খুলে দিয়েছে। এটি ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রামকে সংযুক্ত করেছে, যার দৈর্ঘ্য ৪৭ কিলোমিটার। এর মধ্যে ৩৫ কিলোমিটার সাবমার্সিবল সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। এখানে ২২টি পাকা সেতু ও ১০৪টি কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে। জেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার জন্য বিভিন্ন নদীতে পাঁচটি ফেরিও চালু করা হয়েছে।

 

মূলত রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সড়কটি নির্মাণ করা হয়েছে বলে এলাকায় প্রচার রয়েছে। ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রামের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল হামিদই হাওরবাসীকে এই সড়কের স্বপ্ন দেখিয়েছেন। সংসদ সদস্য এবং স্পিকার থাকাকালে হাওরে যোগাযোগ ব্যবস্থার সমস্যা এবং এমন একটি সড়কের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বহুবার সংসদে আলোচনা করেছেন আবদুল হামিদ। রাষ্ট্রপতির ছেলে আহাম্মদ তৌফিক বর্তমানে এই আসনে সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

কথা হয় স্থানীয় যুবক জুলহাসের সঙ্গে। জুলহাসের বাড়ি ইটনায়। এক সময় বেকার জীবন কেটেছে তার। সড়ক নির্মাণের ফলে এখন মোটরবাইকে করে ভাড়ায় যাত্রী পারাপার করেন। বিশেষ করে যারা দূর-দূরান্ত থেকে বেড়াতে যান তাদের নিয়েই তার ব্যবসা।

তিনি বলেন, ‘হাওরের মধ্যে এমন একটি সড়ক আমরা কল্পনা করেছি মাত্র। হয়তো আমাদের বাপ-দাদারা কল্পনাও করতে পারেননি। আজ আমরা পাকা সড়কে চলাচল করতে পারছি। এ সড়ক নির্মাণের জন্য সম্পূর্ণ অবদান আমরা রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে থাকি। গোটা হাওরবাসীর ভাগ্য খুলে দিয়েছেন। হয়তো আবদুল হামিদ রাষ্ট্রপতি না হলে আমরা এমন উন্নয়ন পেতাম না।’

হাওরের প্রবেশদ্বারে দোকান বসিয়েছেন জাকারিয়া। বলেন, ‘বুঝতেই পারছেন আমার দোকান দেখে। আগেও মানুষ আসত হাওর দেখতে। গত বছর থেকে কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। ছুটির দিনগুলোতে তিল ধারণের ঠাঁই থাকছে না সড়কে। বর্ষায় সড়কের রূপ আরও বাড়ে। একটি সড়ক দেখতে এভাবে মানুষ হাওরে ছুটে আসবে, তা জানা ছিল না। সড়কের কারণে আমাদের যাতায়াতে কী সুবিধা হয়েছে, তা তো নিজ চোখেই দেখে আসলেন।’

জাকারিয়া বলেন, ‘গত এক দশকে হাওরে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। ওই যে দেখেন বিদ্যুতের খুঁটি। ছোট্ট একটি বিচ্ছিন্ন পাড়ায়ও এখন বিদ্যুতের আলো জ্বলে। বাকি সড়ক নির্মাণ হলেই দুঃখ কেটে যাবে।’

 

গত বছরই সড়ক পথটি খুলে দেয়া হয়েছে চলাচলের জন্য। এরপর থেকেই বিশেষ পরিচিতি মেলে ধরেছে নিকলী হাওর। তিনটি উপজেলাকে সরাসরি যুক্ত করলেও গোটা জেলা এমনকি অন্যান্য জেলার দূরত্বকেও কমিয়ে এনেছে। খুব সহজে এবং দ্রুততম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছতে পারছে মানুষ। ভারী যান তথা- বাস-ট্রাক এ সময় না চললেও যাত্রী পরিবহনের জন্য হালকা যান চলাচল করতে পারছে।

আধুনিকমানের সড়কটি দু’পাশের পুরোটা কংক্রিটের ব্লক দিয়ে পিচিং করা। সম্পূর্ণ সড়ক প্রশস্ত এবং মজবুতও বটে। সেতু এবং কালভার্টগুলোও বেশ দৃষ্টিনন্দন। গাছ-গাছালির সৌন্দর্য না থাকলেও ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে সড়কের দু’পাশে। এতেই দুলছে ভ্রমণপিপাসুদের মন।

আলোকিত সিরাজগঞ্জ
আলোকিত সিরাজগঞ্জ