• বুধবার   ০২ ডিসেম্বর ২০২০ ||

  • অগ্রাহায়ণ ১৭ ১৪২৭

  • || ১৬ রবিউস সানি ১৪৪২

৪৯

হজরত ওমর (রা.) এর বিনয় ও আমিত্ব : আমাদের শিক্ষা

আলোকিত সিরাজগঞ্জ

প্রকাশিত: ২৯ অক্টোবর ২০২০  

হজরত ওমর (রা.) রাসূলে কায়েনাতের মুখ থেকে জান্নাতের সুসংবাদ পেয়েছেন। সুবহানাল্লা! আল্লাহ তায়ালা তাকে কতো বড় সম্মান দিয়েছেন যে, কয়েকবার আল্লাহ তায়ালার ওহি তার চিন্তাধারা অনুযায়ী অবতীর্ণ হয়েছে।

এ কথা তো বলা যাবে না যে আল্লাহ তায়ালার ওহি তার চিন্তা অনুযায়ী অবতীর্ণ হয়েছে বরং তার চিন্তা ওহি অনুযায়ী হয়েছে। তার ব্যাপারে রাসূল (সা.) বলতেন,

لو كان بعدي نبیا لكان ُعَمُر

‘আমার পরে যদি কোনো নবী হতো তবে সেটা হতো ওমর।

আরো বলেন, ‘উমরের মুখ দিয়ে সত্য কথা বলে’।

বলা হয়ে থাকে, উমর যে রাস্তা দিয়ে চলে শয়তান সে রাস্তা ছেড়ে দিয়ে অন্য রাস্তা চলে যায়।

হজরত ওমর (রা.) এর দোয়ায় বিনয়:

যার ব্যাপারে রাসূল (সা.) এর মুখ দিয়ে এত ফজিলত ঘোষিত হয়েছে সেই ওমর (রা.) তাহাজ্জুদের সময় আপন পরওয়ারদেগারের কাছে নিজের সমস্ত কিছু বিলিয়ে দিয়ে অন্তরের একান্ত কথা বলতেন। তিনি পরওয়ারদেগারে আলমের কাছে দু’হাত প্রসারিত করে এমন দোয়া করতেন যা আমাদের জন্য চলার পথের আলোর মিনার হয়ে থাকবে। আল্লাহ তায়ালার কাছে তিনি একাগ্র হয়ে বলতেন, ‘হে আল্লাহ! আমাকে আমার নিজের দৃষ্টিতে ছোট করে দিন এবং মানুষের দৃষ্টিতে বড় করে দিন’।

এ জন্য যে, যখন কোনো মানুষ মাখলুকের কাছে বড় বলে পরিলক্ষিত হবে তখন তার জন্য দাওয়াত ও পথপ্রদর্শনের রাস্তা খুলে যাবে। যদি মানুষের চোখে কেউ ক্ষুদ্র হিসেবে দৃশ্যত হয় তখন তাকে দিয়ে দ্বীনী ফায়দা উঠানো সম্ভব নয়। তিনি এ জন্যই এ দোয়া করেছেন  যাতে নফস আত্মগর্ব অনুভব করতে না পারে। আর এর নামই তাসাওউফ।

আমাদের দুরাবস্হা:

আমাদের অবস্হা তো এমন আমরা নিজেদেরকে রাজা-বাদশাহ মনে করি এবং বলতে থাকি মনে যা আসে সেটাই করা উচিত। ভাই, তাহলে আর শরীয়ত রইলো কোথায়? আপনাকে বলার মানুষটাই বা কে? সুফী সাহেব! ঘরে স্ত্রীর সঙ্গে যখন ঝগড়া হয় তখন বলেন, আমার যা ইচ্ছা আমি তাই করবো। বন্ধু বা আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে যখন ঝগড়া হয় তখন বলেন, আমার মনে যা চায় তাই করবো।

ভাই, যতক্ষন পর্যন্ত আমাদের অন্তর থেকে ‘আমার’ ‘আমি’ এ ধরনের শব্দ না দূর হবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা আমাদের নফসকে পরিশুদ্ধ করতে পারবো না। ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের তাসাওউফের হাকীকত বুঝে আসবে না।

হজরত ওমর (রা.) এর বিনয়ের একটি ঘটনা:

আল্লাহ তায়ালা হজরত ওমর (রা.)-কে এতো উঁচু মর্যাদা দান করেছিলেন তবুও তিনি নিজেকে নিয়ে এমন সন্দিহান ছিলেন যে, একবার হজরত হুযাইফা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, আমি জানি রাসূল (সা.) তোমাকে মুনাফেকদের নাম বলেছিলেন। আমি তোমার কাছে মুনাফেকদের সবার নাম জানতে চাচ্ছি না। আমি শুধু তোমার কাছ থেকে এতোটুকু নিশ্চিত হতে চাচ্ছি যে ওই তালিকায় আমার নাম তো নেই? যদি আমার নাম হতো তাবে আমি বলতাম, আমি তো নবী মুহাম্মদ (সা.) এর একান্ত অনুসারী। আমার জন্য তো আল্লাহর রাসূলও দোয়া করেছেন।

দেখুন! দোয়া চেয়ে নেয়ার পরও আল্লাহর সামনে এভাবে নত হয়ে থাকতেন এবং এই সন্দেহ করতেন যে, ওমরের নাম তো ওই তালিকায় নেই! আমরা কি কখনো আমাদের নিজেদের দিকে এভাবে তাকিয়ে দেখেছি? না, বরং আমাদের ঘাড় তো সোজা থাকে সর্বদা। আমাদের চোখ সবসময় খোলা থাকে, দৃষ্টি থাকে আরেকজনের ওপর। ফলে অন্যের দোষ আমাদের খুব বেশিই নজরে আসে কিন্তু নিজেদের দোষ-ত্রুটি নিজেদের চোখে ধরা পড়ে না।

হায়! যদি এই চোখ বন্ধ থাকতো, এই গর্দান ঝুঁকে থাকতো, এই দৃষ্টি থাকতো নিজের অন্তরের ওপর যাতে আমরা দেখতে পারতাম আমাদের ভেতর কী দোষ-ত্রুটি আছে। আজ এই কাজেরই বড় অভাব। হজরত ওমর (রা.) এর মতো অন্য সাহাবাদের অবস্হাও একই রকম ছিল।

হজরত আলী (রা.) এর বিনয়:

একবার এক লোক হজরত আলী (রা.) এর কাছে এলো। তিনি তাবেঈন ছিলেন। তিনি যেহেতু মদিনার ছিলেন না একারণে হজরত আলী (রা.)-কে চিনতে পারলেন না। আলী (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কে? আলী (রা.) উত্তর দিলেন, ‘আমি একজন মুসলমান আদমি’।

প্রিয় পাঠক দেখুন! তিনি এটা বলেননি যে আমি রাসূল মুস্তফা (সা.) এর জামাতা, আমি খাতুনে জান্নাত ফাতেমাতুয যাহরার স্বামী, আমি বেহেশতের যুবকদের সর্দার হাসান-হোসাইনের পিতা, আমি জ্ঞানের দরজা, আমাকে আসাদুল্লাহিল গালেব-আল্লাহর বিজয়ী
সিংহ নামে ডাকা হয়, আমার হাতেই খায়বার বিজিত হয়েছিল।

তিনি তার ব্যাপারে এমন কোনো কথাই বলেননি। নিজের সত্তা, মর্যাদা, স্হান সবকিছুকেই লুকিয়ে রেখেছেন, সেগুলো প্রকাশ করেননি। যখন এই এতো বড় বড় সম্মানী মানুষরাই নিজেদের ব্যাপারে এমন আচরণ করেছেন তখন আপনি আমি কোন ক্ষেতের গাজর-মূলা যে আমাদের বলে বেড়াতে হয়- আমি তো এমন অবস্হান অর্জন করেছি!

আযাযীল শয়তান কীভাবে হয়েছিল:

শয়তানও এ কারণেই অভিশাপে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল। আপনারাই বলুন, শয়তান যখন আল্লাহর সঙ্গে এতো বড় নাফরমানি করেছিলো তখন কি কোনো মদ পান করেছিলো, যে সে এমন মাতাল হয়ে গিয়েছিলো? তার কিসের নেশা ছিল? সে আমিত্বের মদ পান করেছিলো। তার গর্বের নেশা ছিল। সে বলেছিল- আমি তার চেয়ে উত্তম। আমি ওই আদমের চেয়ে সম্মানী। সে তো আমিত্বের মদ পান করেছিল। এর প্রায়শ্চিত্ত তাকে দিতে হয়েছে। কোথায় সে ছিল ফেরেশতাদের নেতা আর কোথায় তাকে বলে দেয়া হলো, তুমি আজ থেকে আমার শত্রু! ‘দূর হয়ে যা এখান থেকে, তুই তো অভিশপ্ত’!

আজ তো আমরা গোনাহ করে শয়তানের নাম দিই, নানা বাহানা দিই। কিন্তু শয়তান যখন নাফরমানি করেছিল তখন শয়তান নামে দ্বিতীয় কেউ ছিল না। তার নাম আযাযীল ছিল। এখন বলুন আযাযীলকে শয়তান কে বানিয়েছিল? এটার কী উত্তর? এটার উত্তর হলো, তাকে তার নফসই শয়তান বানিয়েছিল। নফস এমন একটা জিনিস যখন সেটা বিগড়ে যায় তখন ফেরেশতাদের নেতাকেও শয়তান বানিয়ে দেয়।

আমাদের আসল শত্রু:

এ কারণে আমাদের শয়তানের চেয়ে বেশি আমাদের নফসকে ভয় পাওয়া দরকার। কেননা আল্লাহ তায়ালা শয়তানের ব্যাপারে বলেছেন,ِ ‘শয়তানের ধোঁকাবাজি কৌশল অতন্ত দুর্বল’। কিন্তু যেখানে কোনো মানুষের অন্তরের ধোঁকাবাজির শিকার হওয়ার কথা বর্ণনা করা হয়েছে সেখানে বলা হয়েছে, ‘হে নারীরা! তোমাদের ধোঁকাবাজি তো অত্যন্ত শক্তিশালী’। 

যেখানে মানুষের ধোঁকাবাজির কথা এসেছে সেখানে কোরআন ‘আজীম’ (শক্তিশালী) শব্দ ব্যবহার করেছে আর যেখানে শয়তানের ধোঁকাবাজির কথা বর্ণনা করা হয়েছে সেখানে ‘যঈফ’ (দুর্বল) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এর দ্বারা বুঝা যায় শয়তান সে পর্যন্ত সফলতা অর্জন করতে পারে না যতক্ষণ পর্যন্ত না আমাদের নফস তাকে সাহায্য করে।

সুতরাং আমাদের নফসই আমাদের সবচে বড় দুশমন এবং এটাই আমাদের সবচে বেশি ক্ষতি করে। ঘরের শত্রুকে প্রতিহত করার হাজারো উপায় উপকরণ আমরা প্রস্তুত করি, অথচ আমাদের আসল দুশমন আমাদের নফস। এ কারণেই মাশায়েখে কেরাম নফসের পরিশুদ্ধতার ব্যাপারে জোর দেন।

নফস হত্যা করার উদ্দেশ্য :

নফসকে হত্যা করার দ্বারা উদ্দেশ হলো, মানুষের অন্তরে শরীয়তবিরোধী ইচ্ছাকে যদি হত্যা করা হয়, তাহলে তার ভেতরের ‘আমিত্ব’রও মৃত্যু ঘটবে। এ কারণেই বলা হয়, নফসকে শরীয়ত ও সুন্নাতের ছাঁচে ঢেলে নতুন করে বানিয়ে নেয়া জরুরি। নফসকে নিজের করায়ত্তে আনতে হয়, সেটাকে জয় করতে হয়।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, আমরা নফসকে তো জয় করতে পারি না কিন্তু দুনিয়া জয়ের জন্য আলোচনা করতে পারি। কোনো কোনো লোক এমন শপথও করে যে, হাঁ, আমি দুনিয়া জয় করবো। দুনিয়ায় এটা করবো ওটা করবো। আরে ভাই, নিজের নফসের জন্য কিছু কাজ করে দেখাও না! যাচাই করে দেখুন আপনার নিজের ওপর আপনার রাজত্ব চলে কি না। যদি আপনি আপনার ছয় ফুট শরীরের ওপর রাজত্ব করতে না পারেন তাহলে আপনি দুনিয়ার অমুক অমুক বিরাট কাজের ওপর রাজত্ব করবেন কীভাবে? আল্লাহ আপনাকে সেই কাজের জন্য যোগ্য ভাববেন কীভাবে?

হিন্দিভাষী লেখক মাওলানা আকরাম হুসাইন থেকে অনূদিত

সংগ্রহ : হাবীবুল্লাহ সিরাজ

আলোকিত সিরাজগঞ্জ
আলোকিত সিরাজগঞ্জ
ধর্ম বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর