শুক্রবার   ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০   ফাল্গুন ৮ ১৪২৬   ২৬ জমাদিউস সানি ১৪৪১

সুখী দাম্পত্য জীবনে ইসলামের নির্দেশনা

আলোকিত সিরাজগঞ্জ

প্রকাশিত: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

মানুষের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোর অন্যতম হচ্ছে বৈবাহিক জীবন। যখন মানুষ অবিবাহিত থাকে, মনে হয় জীবন যেন নীড় হারা পাখি। এক পর্যায়ে তার সঙ্গে জীবনসঙ্গী হিসেবে অপরিচিত একজন যুক্ত হয়। তখন সবকিছুতে কেমন যেন একটা পরিবর্তন। স্বভাব-চরিত্র থেকে নিয়ে সর্বত্র একটা শান্তভাব, স্থিতিশীলতা ফিরে আসে। পূর্ণতা পায় ঈমান আমল।

ইমাম বাইহাকি হজরত আনাস (রা.) এর সূত্রে, নবী করিম (সা.) থেকে এ প্রসঙ্গে একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। রাসূল (সা.) উম্মতে মুসলিমাকে লক্ষ্য করে বলেছেন, ‘বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের দ্বারা মানুষের অর্ধেক দ্বীনদারি পূর্ণ হয়ে যায়।

এখন সে যেন বাকি অর্ধেকের পূর্ণতার চিন্তা করে।’ বৈবাহিক সম্পর্কের দ্বারা দু’জন মানুষের মনে যে প্রেম ভালোবাসা জন্ম নেয় তা তুলনাহীন। আমৃত্য সে বন্ধন নিবিড় থেকে আরো নিবিড় হতে থাকে।

হাদিসের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ‘সুনানে ইবনে মাজাহ’তে এ প্রসঙ্গে হাদিস বর্নিত হয়েছে। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) রাসূল (সা.) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, বৈবাহিক সম্পর্কের দ্বারা স্থাপিত ভালোবাসার সম্পর্ক তুলনাহীন।

আমি অন্য কোনো ক্ষেত্রে এমন গভীর সম্পর্ক দেখি না।’ এই ভালোবাসা শুধু স্বামী-স্ত্রীর মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং তারা দু’জনকে ছাড়িয়ে অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনের মাঝেও তা ছড়িয়ে পড়ে। গ্রাম বাংলায় এমন দৃশ্য প্রায়ই দেখা যায়, বিবাদমান দু’টি গোষ্ঠির মাঝে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের ফলে সম্প্রীতি ফিরে এসেছে।

 

 

বৈবাহিক সম্পর্কের দ্বারা দু’জন মানুষের মনে যে প্রেম ভালোবাসা জন্ম নেয় তা তুলনাহীন

 

বিবাহের পর সাংসারিক জীবনের শুরু একজন মানুষের জীবনে টার্নিংপয়েন্ট। তখন থেকে কারো কারো জীবনে নেমে আসে অনাবিল শান্তি। স্বর্গের সুখ তারা এ দুনিয়াতে থেকেই ভোগ করতে থাকেন। এর জন্য প্রয়োজন পাত্র-পাত্রী যোগ্য হওয়া।  ইবনে মাজার এক হাদিসে এসেছে, তাকওয়ার পর একজন মানুষের সবচেয়ে বড় অর্জন হচ্ছে যোগ্য পাত্রী পাওয়া।

নবী করিম (সা.) সেখানে যোগ্য পাত্রীর কিছু বর্ণনা দিয়েছেন। যোগ্য পাত্রীর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, পাত্রী নেককার, স্বামীর অনুগত, স্বামীর আনন্দের কারণ ও স্বামীর আমনত হেফাজতকারী হওয়া।

স্বামীরও কিছু গুণাগুণ আছে, যেগুলো থাকলেই স্বামী যোগ্য বলে বিবেচিত হবে। তিরমিজী শরিফের এক হাদিসে এসেছে, স্বামীর গুণাগুণের অন্যতম দু’টি গুণ হচ্ছে, স্বভাব-চরিত্র ঠিক থাকা ও দ্বীনদার হওয়া। মূলত এ দু’টি ঠিক থাকলে শাখাগত বিষয় হিসেবে বাকিগুলো এমনিতেই চলে আসবে।

আবার সংসার জীবন কারো কারো জন্য স্বর্গ না হয়ে, হতে পারে জ্বলন্ত জাহান্নাম। অনেক অনাস্থা ও দূরত্বের কারণে জীবনের কোনো স্বাদ উপভোগ করতে পারেন না। হাদিসের এ ব্যাপারেও বর্ণনা পাওয়া যায়। রাসূল (সা.) বলেন, দিন শেষে শয়তানের দল ইবলিসের কাছে নিজেদের অপকর্মের হিসেব দেয়। কেউ বলে, আমি এত জনকে বেঈমান করে রেখে এসেছি। সুদের লেনদেনে লিপ্ত করার বয়ান শোনায় কেউ কেউ। এভাবে বিভিন্ন অপকর্মের তালিকা তোলে ধরা হয়। শেষে একজন নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করে বলে, আমি তেমন কিছুই করতে পারি নাই। তবে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ঝগড়া লাগিয়ে এসেছি। ইবলিস এই অপকর্মে এত বেশি খুশি হয় যে, ওই শয়তানকে নিয়ে নাচতে থাকে।’ এর দ্বারা বুঝা যায় স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ঝগড়া কত সুদূর প্রসারী খারাপ পরিণতি বয়ে আনতে পারে।

অনেক অভিভাবক জোর করে ছেলে-মেয়েদের বিয়ে দেন। তাদের পছন্দ-অপছন্দের দিকে অভিভাবক ভ্রুক্ষেপ করতে চান না। বিয়েতে অমত দেয়াকে মনে করা হয় অমার্জনীয় অপরাধ।

অথচ প্রাপ্ত ছেলে মেয়েকে জোর করে বিয়ে দেয়া, তাদের পছন্দ-অপছন্দের দিকে কোনোরূপ ভ্রক্ষেপ না করা এক ধরনের অন্যায়ে শামিল (তবে এর দ্বারা প্রচলিত বিবাহের পূর্বের সম্পর্ক করে পছন্দ করা উদ্দেশ নয়)। বরং এভাবে বিবাহ দেয়ার দ্বারা বিবাহের উদ্দেশ্যগুলো অপূর্ণ থেকে যায়।

ইসলাম, প্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে-মেয়েকে স্বাধীনতা দিয়েছে। বংশীয় সমতা ও শরয়ী অন্যান্য বিষয় মেনে তারা নিজেরাই পছন্দের জায়গায় বিবাহ করতে পারবে। এটাকে খারাপ মনে করার কোনো সুযোগ নেই। বর্তমানে অনেক বিষয় না জানার কারণে, সামাজিক প্রথাকে দ্বীন মনে করে হয়। এরপর তা পালন করা দ্বারা যখন বিভিন্ন খারাপি দেখা দেয় তখন এর দায় চাপানো হয় ইসলামের ওপর।

আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইসলামের বিধানকে সামাজিক প্রথা মেনে উপেক্ষা করা হয়। তখন ইসলামের বিধানের স্থলে অন্য কিছু করার দ্বারা খারাপ দিকগুলো সামনে আসতে থাকে তখন ইসলামের প্রতি দোষারোপ করা হয়। অথচ দুয়ের মাঝে নুন্যতম কোনো সম্পর্ক নেই।

পছন্দের জীবনসঙ্গী বেছে নেয়ার অধিকার: পাত্র-পাত্রীর পছন্দকে গুরুত্ব দিয়ে বিবাহ সম্পাদন করতে নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে ‘তোমাদের মধ্যে যারা মৃত্যু বরণ করে এবং স্ত্রী রেখে যায়, তাদের স্ত্রীরা চার মাস দশ দিন প্রতীক্ষায় থাকবে।

অতঃপর যখন তারা তাদের উদ্দেশ্যের শেষ সীমায় পৌঁছবে (তথা ইদ্দত পূর্ণ করবে), তখন তারা নিজেদের বিষয়ে নিয়ম অনুসারে যা করবে তাতে তোমাদের কোনো গোনাহ নেই। আর তোমরা যা কিছু কর, আল্লাহ সে সম্বন্ধে সম্যক অবহিত।’ (সূরা: বাকারা, আয়াত: ২৩৪)।

বিবাহে পুরুষদের পক্ষ্য থেকে বাধা না দিতে নির্দেশনা জারি করে অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তোমরা যখন স্ত্রীদের তালাক দাও, অতঃপর তারা তাদের ইদ্দতের শেষ সীমায় পৌঁছে যায় (অর্থাৎ ইদ্দত পূর্ণ করে ফেলে), তখন তোমরা  (হে অভিভাবকেরা!) তাদের বাধা দিয়ো না তাদের প্রথম স্বামীদের বিবাহ করতে, যদি তারা নিয়মানুসারে পরস্পর রাজি হয়ে যায়। এর দ্বারা তোমাদের মধ্যে তাকেই নসীহত করা হচ্ছে, যে আল্লাহ ও কেয়ামত দিবসে ঈমান রাখে। এটাই তোমাদের জন্য বেশি পরিচ্ছন্ন ও অধিক পবিত্র পথ। এবং আল্লাহ জানেন, তোমরা যা জান না।’ (সূরা: বাকারা, আয়াত: ২৩২)। 

উল্লিখিত আয়াতে কয়েকটি বিষয় লক্ষণীয়-

এক. তালাকের পর যদি স্বামী-স্ত্রী মিলেমিশে ঘর সংসার করতে রাজি হয়ে যায় তাহলে অভিভাবকের পক্ষ থেকে এখানে বাধা সৃষ্টি করা উচিত নয়। অবশ্য তা তিন তালাকে বিচ্ছেদ না হলে। কারণ, তিন তালাকে বিচ্ছেদ হলে, ইসলামি শরীয়া মোতাবেক স্বামী-স্ত্রী চাইলেও ঘর সংসার করতে পারবে না। আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, বাধা না দেয়ার নসীহত তাদেরকে করা হচ্ছে যারা জবাবদিহিতার ভয় করে।

অর্থাৎ মুমিনদেরকে। অভিভাকরা ন্যায়সঙ্গত কোনো কারণ ছাড়া বাধা দিলে আখেরাতে আল্লাহর কাছে জবাব দিতে হবে। অভিভাবক হলেই তার জন্য সবকিছু বৈধ বিষয়টি এ রকম নয়।

দুই. স্বামী-স্ত্রী মিলেমিশে সংসার করতে চাইলে তাতে বাধা না দেয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে পবিত্রতা রক্ষা করা। অর্থাৎ তারা মিলেমিশে থেকে ঘর সংসার করার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করলে চারিত্রিক ধ্বস নামতে পারে। যে কোনো সময় শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়ে যেতে পারে। প্রথম আয়াতে ‘তারা নিজেদের বিষয়ে নিয়ম অনুসারে যা করবে তাতে তোমাদের কোনো গোনাহ নেই।’ দ্বারা বিবাহ সহ সব বিষয় উদ্দেশ্য। অর্থাৎ নিয়ম মেনে নিজেরা বিবাহ করলে তাতে গোনাহের কোনো কিছু নেই।

ইসলাম শুরুর যুগে স্বামী মারা গেলে স্ত্রীদের ইদ্দতের সময় ছিলো এক বছর। ওই সময়ের বিধান আলোচনা করতে গিয়ে আল কোরআনে বলা হয়েছে, যদি এর আগে স্ত্রীরা ঘর থেকে বের হয়ে নিজেরা, নিজেদের কল্যাণে কোনো সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে তাতে কোনো সমস্যা নেই। (সূরা: বাকারা, আয়াত: ২৪০)।

মুসলিম শরিফে হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) এর সূত্রে এ প্রসঙ্গে একটি রেওয়াত পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়েছে, ‘প্রাপ্ত বয়স্ক পাত্রী নিজেই নিজের বিবাহের বিষয়ে বেশি হকদার। অভিভাবকের চেয়েও তার নিজের সিদ্ধান্ত বেশি গ্রহণযোগ।’

উল্লিখিত আয়াতগুলোতে বিবাহিতা নারীর কথা বলা হলেও, এর দ্বারা প্রাপ্ত বয়স্ক নারী উদ্দেশ্য। চাই সে বিবাহিতা হোক বা অবিবাহিতা। নারী যদি শরীয়তের নিয়ম মেনে বিবাহ করে তাহলে তাতে বাধা না দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

অভিভাবকের ব্যক্তিগত খেয়াল-খুশি, বিরাগ-বিরূপতাকে স্থান দিতে নিষেধ করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে আমাদের সমাজে এমন দৃশ্যই দেখতে হয় যে, পাত্র-পাত্রীর অপছন্দ সত্বেও অভিভাবকের চাপে পড়ে বিবাহে সম্মতি দিতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে তো তাদের সম্মতি বা অসম্মতির প্রতি কোনো ভ্রুক্ষেপই করা হয় না। এটা তাদের অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ করার নামান্তর। প্রাপ্ত বয়স্ক পাত্রীর অনুমতি নিয়ে বিবাহের কথা চূড়ান্ত করার নির্দেশ বহু হাদিসে দেয়া হয়েছে।

সম্মতি নিয়ে বিবাহের কথা চূড়ান্ত করা: বিবাহের সম্মতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সম্মতি ছাড়া বিবাহে বাধ্য করা এক ধরনের জুলুম। রাসূল (সা.) এর বহু হাদিসে সম্মতির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ফুটে ওঠেছে। হজরত আবু হুরাইরা (রা.) এর সূত্রে, সহিহ বোখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, নবী করিম (সা.) বলেন, বিবাহিতা নারীকে পুনরায় বিবাহের সময় তার মৌখিক অনুমতি লাগবে। সরাসরি মৌখিক অনুমতি ছাড়া তাকে বিবাহ দেয়া যাবে না। আর অবিবাহিতা মেয়ের ক্ষেত্রেও অনুমতি নিতে হবে। তবে তার চুপ থাকাটাও অনুমতি হিসেবে বিবেচ্য হবে।’ অবিবাহিতার ক্ষেত্রে চুপ থাকাই অনুমতি হিসেবে গণ্য হওয়ার কারণ হচ্ছে, তারা বিবাহের বিষয়ে কথা বলতে লজ্জা পায়।

বোখারী শরিফের এক বর্ণনায় এসেছে, ‘হজরত খানসা বিনতে খোজাম (রা.) নামীয় এক  নারী, নবী করিম (সা.) এর কাছে অভিযোগ করলো, তার অসন্তুষ্টি সত্বেও তার পিতা তাকে বিবাহ দিয়েছে। তখন রাসূল (সা.) ওই বিবাহকে রদ করে দিলেন।’

কোনো কোনো বর্ণনায় পাওয়া যায় অভিভাবক ছাড়া বিবাহ করলে সে বিবাহ বাতিল বলে সাব্যস্ত হবে। এখানে কোরআনের আয়াত ও হাদিসের মাঝে বিরোধ দূর করার জন্য ফকীহরা বলেন, আয়াতে যে বলা হয়েছে, বিবাহের ব্যাপারে নিজেরা বেশি হকদার, এর দ্বারা মূলত প্রাপ্ত বয়স্ক নারী উদ্দেশ্য। আর হাদিসে অভিভাবক ছাড়া বিবাহ বাতিল হওয়ার ক্ষেত্র হচ্ছে অপ্রাপ্ত বয়স্ক মেয়ে যদি নিজে নিজে বিবাহ করে ফেলে। আলোচনার সারকথা হচ্ছে, প্রাপ্ত বয়স্ক মেয়ে নিজে বিবাহ করতে পারবে এবং অভিভাবক বিবাহ দিলে তার অনুমতি লাগবে।

দেখে পাত্র-পাত্রী পছন্দ করার অধিকারও প্রত্যেকের আছে। এক সাহাবি নিজের বিবাহের বিষয়ে পরামর্শ করলে, রাসূল (সা.) তাকে দেখে বিবাহ করার পরামর্শ দিলেন। তাই পাত্র-পাত্রী দেখে নেয়ার ক্ষেত্রে কার্পণ্যতা ঠিক নয়। এর দ্বারা সংসার জীবনে ঝামেলা হতে পারে। আরো অন্যান্য হকগুলো জেনে সেগুলোও আমাদের নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে আল্লাহর রহমত হবে। পরিবার সুখের হবে।  

আলোকিত সিরাজগঞ্জ
আলোকিত সিরাজগঞ্জ
এই বিভাগের আরো খবর