• মঙ্গলবার   ২০ এপ্রিল ২০২১ ||

  • বৈশাখ ৭ ১৪২৮

  • || ০৮ রমজান ১৪৪২

প্রকৃতিকে জয় করতে কাজ করছে কাজীপুরের যমুনা চরের নারীরা

আলোকিত সিরাজগঞ্জ

প্রকাশিত: ১ মার্চ ২০২১  

ভাঙন কবলিত যমুনা চরের সহস্রাধিক অসহায় নারী বেঁচে থাকার জন্য প্রকৃতির সঙ্গে নিরন্তর সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। ইউনিয়ন গভার্ন্যান্স প্রকল্পের মাধ্যমে তারা প্রকৃতির নির্মমতা-নিষ্ঠুরতার সাথে লড়াই করে ওদের বেঁচে থাকার সংগ্রামে জয়ী হতে চলেছে। যেখানে ভাঙন-ক্ষুধা-দারিদ্র্য ওদের বেঁচে থাকার অনাকাক্সিক্ষত অনুষঙ্গ। একদিকে প্রকৃতির চরম পৈচাশিকতা অপরদিকে বেঁচে থাকার দুর্নিবার প্রচেষ্টার মধ্যে ওদের সোনালী স্বপ্নের বুণন। ভাঙন কবলিত যমুনার করাল গ্রাস থেকে বাঁচার প্রত্যাশায় ধু-ধু মরুভূমিসম বালির পথ পেরিয়ে পুরুষের পাশাপাশি ওরা  চলে নতুন ঠিকানায়। কিন্তু সর্বগ্রাসি যমুনা সেখানেও হানা দিয়ে ওদের করছে সর্বস্বান্ত। এর পরেও ওরা দুর্নিবার।

পাড় ভাঙে, চর ডোবে। দু’কুলপ্লাবিত করে বানের পানি ওদের স্বপ্নকে ধুয়ে মুছে নিয়ে যায়। এর ফলে প্রতিনিয়তই অভাব আর সীমাহীন দারিদ্র্যতার কবলে কেবলই ওদের ক্ষুধার হাহাকার। এর সাথে প্রকৃতির আরেক দুর্যোগ শোক-জ্বরা-ব্যাধি জীবনকে দুর্বিষহ করলেও থেমে থাকে না হাজেরা ,তফুরা, খোদেজা, চানভানু, করিমন বেগমদের মতো হাজারো নারীর জীবন। অবিরাম জীবন সংগ্রামী যমুনা চরের নারীরা জীবনের কাছে হার মানতে শিখেনি। প্রবল ভাঙন, ভূমিক্ষয়, বার বার বন্যা, প্রচ- ঝড়, ক্ষুধা-বঞ্চনা আর দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত উত্তর জনপদের সহস্রাধিক অসহায় নারী প্রকৃতির সঙ্গে নিরন্তর সংগ্রাম করছে। বিশেষ করে প্রতিবছর উজানের পাহাড়ি ঢলে যমুনা-ব্রক্ষপুত্র-ইছামতি-ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে।

বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলের হাজার হাজার ঘরবাড়ি, শস্যক্ষেত বানের পানিতে তলিয়ে যায়। আয়-রোজগারহীন দরিদ্র ভূমিহীন হাজার হাজার নারীর জীবন হয়ে পড়ে বিপন্ন। বছরের আর্শি¦ন-কার্তিক মাসে চরাঞ্চলে কাজের অভাবে শুরু হয় নীরব মঙ্গা। এ সময় নৌ-চলাচল, মাছসহ থাকে না কোনো কাজ। ক্ষেতের ফসল অথবা দিন মজুরের কাজও সীমিত হয়ে পড়ে। এ কারণে কাজের সন্ধানে অনেকে শহরে যায়। নিরুপায় অনেকেই ঘরের টিন, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি বিক্রি করে কিছুদিন সংসারের চাকাকে সচল রাখে। ভূমিহীন নিঃস্ব দিন মজুররা কচু-ঘেচু খেয়ে অর্ধহারে-অনাহারে মানবেতর জীবন কাটায়। দীর্ঘদিনের অনাহার ও অপুষ্টিজনিত কারণে এসময় রোগাক্রান্ত হয়ে অনেক নারী, শিশু ও বয়স্কারা অকাল মৃত্যুর শিকার হয়।

নদীভাঙনে বার বার বসতবাড়ি স্থানান্তর ওদের নিত্যসঙ্গী। প্রতিদিন ইঞ্চি ইঞ্চি ভাঙন  হাজার হাজার চরবাসীর স্বপ্নকে গ্রাস করছে। নিঃস্ব হচ্ছে ওরা। তবুও চরের মাটি কামড়ে পড়ে আছে। যমুনার প্রায় অর্ধশত চর ঘুরে জানা গেছে নারীদের বেঁচে থাকার সংগ্রামী জীবন কাহীনি। প্রকৃতি ওদের এত কষ্ট দেয়, তবু তার ওপর নির্ভর করেই ওদের জীবন সাজে স্নেহ-মায়ায়-ভালোবাসায়। বেঁচে থাকে ওরা। ওরা জানেনা মৌলিক চাহিদা। শুধু জানে ক্ষুধার জ্বালা, নদীর ভাঙন, নতুন স্থানে বসতি স্থাপন, বালিকাময় মাটিতে চাষাবাদ, মাছ ধরা। জীবনের অনেক কিছু থেকেই বঞ্চিত যমুনার চরের হাজার হাজার নারী আজ নানা সামাজিক বঞ্চনায় দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছে। অসুখে নেই  চিকিৎসা।

ঝাড়-ফুঁক আর কবিরাজের নির্দেশনা ওদের বেঁেচ থাকার দাওয়াই। গর্ভবতি ও প্রসূতি মায়েদের অবস্থা সেই আদিম সভ্যতাকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। ছেলে-মেয়েদের জন্য নেই শিক্ষার ব্যবস্থা। সারাদিনে যা রোজগার হয়, তাতে চালিয়ে নিতে হয় সংসার। বার বার প্রমত্তা যমুনার সঙ্গে লড়াই করে চরের নারীরা ক্লান্ত-বিপর্যস্ত। বার বার ওদের বেঁচে থাকার স্বপ্নে আঘাত হেনে চলেছে রাক্ষুসী যমুনা। ওদের জীবন মান নিয়ে তেমন কেউ কাজ করে না। দু’একটি এনজিও কাজ করলেও সেটা খুব কাছের যে চরগুলো আছে তার সামান্য একটি অংশে তারা কার্যক্রম চালায়। তাও দেখা গেছে চরে না গিয়ে শুধু ফাইল ওয়ার্কেই তা সীমাবদ্ধ থাকে। আর সরকারিভাবে অনেক স্বপ্নের কথা বলা হলেও কার্যকর কোন ব্যবস্থা আজ অব্দি ওদের জন্য করা হয়নি। এটাই বাস্তব।

আর এসবকিছু চিন্তা করেই কাজীপুরে গৃহিত হয়েছে উপজেলা পর্যায়ে ইউজেডজিপি আর ইউনিয়ন পর্যায়ে ইউপিজিপি প্রকল্প। ইউএনডিপির সহায়তায় স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে এসব প্রকল্প নারীদের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে সচল হয়েছে ইউনিয়ন ও উপজেলা পরিষদ। তারা চরের নারীদের ভাগ্যোন্নয়নে নানামুখি প্রকল্প  বাস্তবায়ন করে চলেছে। সেলাই প্রশিক্ষণ, ধাত্রী প্রশিক্ষণ, ঠোঙ্গা বানানো, ড্রাইভিং প্রশিক্ষণের মতো প্রকল্পগুলি ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। আরও নানা প্রকল্প শুরুর পথে। সেদিন আর বেশি দূরে নয় সেদিন ওদের জীবনের সংগ্রামি  ইনিংস স্বনির্ভরতার আলোয় ভরপুর হয়ে উঠবে।  ওদের জীবনের স্বপ্নীল ভোর হতে আর দেরি নেই। 

আলোকিত সিরাজগঞ্জ
আলোকিত সিরাজগঞ্জ