• শুক্রবার   ৩০ অক্টোবর ২০২০ ||

  • কার্তিক ১৪ ১৪২৭

  • || ১৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

৭৪

নেক সুরতে শয়তানের ধোঁকা থেকেও বিরত থাকুন

আলোকিত সিরাজগঞ্জ

প্রকাশিত: ১৬ অক্টোবর ২০২০  

হজরত শায়খ আব্দুল ওহাব শা’রানী রহ. হজরত শায়খ আব্দুল কাদের জিলানী রহ. এর ব্যাপারে একটি ঘটনা লিখেছেন। তিনি উঁচু মানের একজন আল্লাহর অলি।

একবার শায়খ আব্দুল কাদের জিলানী রহ. তাহাজ্জুদ পড়ছিলেন। এ সময় তিনি দেখলেন একটি নূর চমকালো। পুরো পরিবেশ আলোকিত হয়ে গেল। সে নূর থেকে আওয়াজ আসলো, হে আব্দুল কাদের! তুমি আমার এবাদতের হক আদায় করে দিয়েছ। এ যাবৎ যে এবাদত তুমি আদায় করেছ তা যথেষ্ট। আজকের পর তোমার উপর না নামাজ ফরজ না রোজা ফরজ। সব এবাদতের নির্দেশ তোমার থেকে উঠিয়ে নেয়া হলো।

নূর থেকে এ আওয়াজ আসল। যেন আল্লাহ তায়ালা বলছেন তোমার এবাদত এমন কবুল হয়েছে, ভবিষ্যতে তোমার আর এবাদতের প্রয়োজন নেই। হজরত আব্দুল কাদের জিলানী রহ. যখন এ নূর দেখলেন, আওয়াজ শুনলেন, তৎক্ষনাত উত্তরে বললেন, দূর  হ কমবখত! দূর হ। আমাকে ধোঁকা দিচ্ছ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে তো এবাদত মাফ হয়নি। তার উপর থেকে এবাদতের নির্দেশ শেষ হয়নি, আমার উপর থেকে শেষ হয়ে যাবে? আমাকে ধোঁকা দিতে চাচ্ছ?

দেখুন শয়তান কত বড় আক্রমন করেছে। যদি তার অন্তরে এবাদতের গর্ব এসে যেত তাহলে পদস্খলিত হয়ে যেতেন। যারা কাশফ-কেরামত তথা অলৌকিকতার পেছনে লেগে থাকে, তাদেরকে ধ্বংস করার জন্য এটা শয়তানের মারাত্মক আক্রমন ছিল। তবে শায়খ তো শায়খ ছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে বুঝে ফেললেন এটা আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে হতে পারে না। কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে তো এবাদতের আদেশ রহিত হয়নি। আমার থেকে কীভাবে রহিত হবে?

শয়তানের দ্বিতীয় আক্রমন:

কিছুক্ষণ পর আরো একটি নূর চমকালো। পরিবেশ আলোকিত হয়ে গেল। সেই নূর থেকে আওয়াজ আসল, হে আব্দুল কাদের! আজ তোমার ইলম তোমাকে রক্ষা করেছে। অন্যথায় এ আক্রমনের মাধ্যমে আবেদকে আমি ধ্বংস করেছি। হজরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) দ্বিতীয় বললেন, কমবখত! দ্বিতীয়বার আমাকে ধোঁকা দিচ্ছ! আমার ইলম আমাকে রক্ষা করেনি। আল্লাহর অনুগ্রহ আমাকে রক্ষা করেছে। এ দ্বিতীয় আক্রমনটি প্রথম আক্রমনের চেয়ে বেশি মারাত্মক ও ভয়াবহ ছিল। কারণ এর মাধ্যমে তার ভেতরে ইলমের বড়ত্ব ও অহংকার সৃষ্টি করতে চাচ্ছিল।

দ্বিতীয় হামলার ভয়াবহতা:

হজরত শায়খ আব্দুল ওহাব শা’রানী রহ. এ ঘটনা বর্ণনার পর বলেন, প্রথম হামলাটি এত মারাত্মক ছিল না। কেননা শরীয়তের সামান্য জ্ঞান রাখে এমন যেকোনো ব্যক্তি বুঝতে পারবে-জীবনে চেতনা থাকা অবস্থায় কোনো মানুষ থেকে এবাদত মাফ হতে পারে না। তবে দ্বিতীয় আক্রমনটি ছিল বড় মারাত্মক। কত মানুষ এ আক্রমনের শিকার হয়ে বিভ্রান্ত হয়েছে এর ইয়ত্তা নেই। কারণ এতে স্বীয় জ্ঞানের উপর অহংকার সৃষ্টি করাই উদ্দেশ্য ছিল। এটি অনেক সুক্ষ্ণ বিষয়।

সীমাতিরিক্ত বিনয়:

হজরত বলেন, দ্বীনের কর্মীদের মধ্যে কখনো অহংকার সৃষ্টি হয়ে যায় আবার কখনো এর উল্টো-সীমাতিরিক্ত বিনয় সৃষ্টি হয়ে যায়। বিনয় তো ভালো জিনিস। তবে সীমার ভেতর থাকা চাই। সীমাতিরিক্ত বিনয়ও ক্ষতিকারক।

সীমাতিরিক্ত বিনয়ের একটি ঘটনা:

হজরত থানবি রহ. স্বীয় ওয়াজে একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন- একবার আমি ট্রেনে ভ্রমণ করছিলাম। আমার নিকটে আরো কিছু লোক বসা ছিল। যখন খাওয়ার সময় এলো, তারা নিজেদের খাবার বের করল। দস্তরখান বিছালো। সাথীদেরকে একত্রিত করে খেতে শুরু করল। আমরা যেভাবে বিনয়ের সঙ্গে বলি আসুন, কিছু ডাল-ভাত খেয়ে নিন, সেভাবে তারাও নিকটে উপবিষ্ট লোকদেরকে বিনয়ের সঙ্গে বলছে- ‘মল-মূত্র কিছু খেয়ে নিন’। তারা বিনয়ের সঙ্গে নিজদের খাবারকে মল মূত্র বলে দিয়েছে। - العياذ بالله আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই।

আল্লাহ প্রদত্ত রিজিককে মল-মূত্র বলা সীমাতিরিক্ত বিনয়ের অন্তর্ভুক্ত। কারণ বিনয়ের ফলে এমন কাজ প্রকাশ পেয়েছে যার দ্বারা আল্লাহ তায়ালার নেয়ামতের অকৃতজ্ঞতা ও অবজ্ঞা হয়। এটি খারাপ কথা। বিনয় সীমা ছাড়িয়ে যাওয়াই অকৃতজ্ঞতা। কারণ এর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার তাকদিরের উপর আপত্তি আসে। তাই এটা বড়ই মারাত্মক বিষয়।

নামাজকে ঠোকর মারা বলো না:

সীমাতিরিক্ত বিনয় মানুষকে নৈরাশ্যে পৌঁছে দেয়। মানুষের ভেতরে নৈরাশ্য সৃষ্টি করে। যেমন আপনি মানুষ থেকে এ বাক্য শুনে থাকবেন-আরে আমার আবার নামাজ! আমি তো ঠোকর মারি কেবল। নামাজ আদায়কে ঠোকর মারা শব্দে ব্যক্ত করা সীমাতিরিক্ত বিনয়। এরূপ করা উচিত নয়। বরং আল্লাহ তায়ালার তওফিকের শুকরিয়া আদায় করা চাই।

তিনি নিজ দরবারে উপস্থিত হওয়ার তাওফিক দিয়েছেন। কত মানুষ আছে যারা তার দরবারে উপস্থিত হওয়ার তাওফিক পায়নি। এ জন্য নামাজের অবমূল্যায়ন ও অকৃতজ্ঞতা কেন করছ? এটা ঠিক আছে- তোমার নামাজে অনেক ত্রুটি আছে। তবে ত্রুটিগুলো তোমার আর তাওফিক তো আল্লাহর। তাই প্রথমে তাওফিকের জন্য শুকরিয়া আদায় করো আর ত্রুটির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো।

আল্লাহ তায়ালার কাছে বলো- হে আল্লাহ! আপনি আমাকে নামাজ পড়ার তাওফিক দিয়েছেন। তবে আমি এ নামাজের হক আদায় করতে পারিনি। - أستغفر الله এ জন্য প্রথমে এ এবাদতের তাওফিকের জন্য শুকরিয়া আদায় করো এরপর নিজের ত্রুটির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো। এটা বলো না-আমার নামাজ তো ঠোকর মারা। এ কথা বলা কোনোভাবেই ঠিক নয়।

ত্রুটির উপর ক্ষমা প্রার্থনা করো:

যখন তোমরা নিজেদের ত্রুটির উপর ক্ষমা প্রার্থনা করবে, যিনি এবাদতের তাওফিক দিয়েছেন তিনি তোমাদের ক্ষমা প্রার্থনা কবুল করে ওই এবাদতে পূর্ণতা দান করবেন ইনশা-আল্লাহ! আল্লাহ তায়ালার এবাদতের হক আদায় করতে পারে- এমন কোনো মানুষ নেই। আমরা তোমরা তো দূরের কথা, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যিনি রাতে তাহাজ্জুদ নামাজে দাঁড়ানোয় তার পা মোবারক ফুলে যেত, তিনি বলতেন,

ما عبدناك حق عبادتك و ما عرفناك حق معرفتك

‘আমরা আপনার এবাদতের হক আদায় করতে পারিনি। তিনি যখন এ কথা বলছেন, আমরা কী করে তার এবাদতের হক আদায় করব? তার তুলনায় আমাদের সব এবাদতেই ত্রুটি থাকবে। তবে আল্লাহ তায়ালা যখন স্বীয় দরজায় আসার তওফিক দিয়েছেন, স্বীয় আস্তানায় সেজদা করার তাওফিক দিয়েছেন, তার প্রতি এ মন্দ ধারণা কীভাবে করবে-তিনি সেজদা কবুল করবেন না? কীভাবে তোমরা এ সেজদার অবমূল্যায়ণ করে বলছ- এটা অপবিত্র সেজদা? যখন তোমরা তার দেয়া তাওফিকের উপর শুকরিয়া আদায় করে ক্ষমাপ্রার্থনা করবে, বলবে- হে আল্লাহ! এ এবাদতের ত্রুটি-বিচ্যুতি স্বীয় রহমতে ক্ষমা করে দাও, অবশ্যই আল্লাহ তায়ালা ওই ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো ক্ষমা করে দেবেন।

এবাদত ছাড়ানোর পদ্ধতি:

শয়তান সীমাতিরিক্ত বিনয় সৃষ্টি করে তাকে ধোঁকা দেয়। তার অন্তরে এ কল্পনা সৃষ্টি করে-আমি অহংকারের রোগে আক্রান্ত নই তো! কারণ আমি আমার নামাজকে কিছু মনে করি না। সঙ্গে সঙ্গে বিনয় অবলম্বন করি। তবে এ চিন্তা যখন বেশি হয়ে যায়, ক্রমান্বয়ে তার অন্তরে নৈরাশ্য সৃষ্টি করে দেয়- এ এবাদত করা তোমার সাধ্যের ভেতরে নয়। তোমার নামাজ কখনো কবুল হবে না। যখন কবুলই হবে না, পড়ে লাভ কী? ছেড়ে দাও, ঘরে বসে থাক। এভাবে শয়তান নামাজ ছাড়ায়।

এবাদতের শুকরিয়া আদায় করো:

মনে রেখ, যখনই আল্লাহ তায়ালা কোনো আমল করার তাওফিক দেন, এর উপর কৃতজ্ঞতা আদায় করো। কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের সঙ্গে সঙ্গে বলো, হে আল্লাহ! আপনার তাওফিকেই আমি এ এবাদত আদায় করতে পেরেছি। এতে আমার পক্ষ থেকে যে ত্রুটি হয়েছে, স্বীয় রহমতে একে ক্ষমা করে দাও। সাহাবায়ে কেরাম বলতেন, হে আল্লাহ! আপনার তাওফিক না হলে আমরা হেদায়াত পেতাম না। আপনার তাওফিক না হলে আমরা দান-সদকা করতে পারতাম না, নামাজ পড়তে পারতাম না। যা কিছু এবাদত হয়, আপনার তাওফিকেই হয়। এ জন্য আমরা এ তাওফিকের উপর শুকরিয়া আদায় করি। নিজেদের ত্রæটির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করি। 

ব্যস! এ দু’টি বিষয় যদি অর্জিত হয়ে যায়, না অহংকার সৃষ্টি হবে, না সীমাতিরিক্ত বিনয় সৃষ্টি হবে। শয়তানের হাতিয়ার এ দু’টিই।

আলোকিত সিরাজগঞ্জ
আলোকিত সিরাজগঞ্জ
ধর্ম বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর