• বৃহস্পতিবার   ২৬ নভেম্বর ২০২০ ||

  • অগ্রাহায়ণ ১২ ১৪২৭

  • || ১০ রবিউস সানি ১৪৪২

৩২৬

দ্যা বস, দ্যা নড়াইল এক্সপ্রেস

আলোকিত সিরাজগঞ্জ

প্রকাশিত: ২৫ জুন ২০১৯  

মাশরাফিকে নিয়ে লিখতে বসলে আসলে ব্যাপারটা একটা ভয়াবহ সমস্যা দেখা দেয় প্রথম শব্দ থেকেই। এই লোকটি কতটা অসাধারণ পারলে প্রতিদিন সেটা নিয়ে একবার করে কেউ না কেউ লিখে। কেউ না কেউ বলে নি এমন কোন কথা মনে হয় এই ব্যাক্তিকে নিয়ে নেই। খেলোয়াড়ের সীমা ছাড়িয়ে মানুষ, মানুষের সীমানা ছাড়িয়ে নায়ক কখনো নায়কের সীমানা ছাড়িয়ে মহানায়ক। মানুষের মনে এই লোকটিকে নিয়ে অনুভূতি এত প্রখর যে মিরপুরের গ্যালারীতে গালিগালাজ সমৃদ্ধ একদল অবুঝ দর্শকে ভরা থাকার এত দুর্নাম এর পরেও এই লোকটা হাটুতে চোট পেয়ে পড়ে গেলে ২৫ হাজার দর্শক এর মুখের কথা একবারে বন্ধ হয়ে যায়। মিরপুরে খেলা চলাকালে নেমে আসে অদ্ভুত এক নীরবতা।


বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলা নড়াইল-এ মাশরাফির জন্ম। ছোটবেলা থেকেই তিনি বাঁধাধরা পড়াশোনার পরিবর্তে ফুটবল আর ব্যাডমিন্টন খেলতেই বেশি পছন্দ করতেন, আর মাঝে মধ্যে চিত্রা নদীতে সাঁতার কাটা।তারুণ্যের শুরুতে ক্রিকেটের প্রতি তার আগ্রহ জন্মে, বিশেষত ব্যাটিংয়ে; যদিও এখন বোলার হিসেবেই তিনি বেশি খ্যাত, যেজন্যে তাকে 'নড়াইল এক্সপ্রেস' নামেও অভিহিত করা হয়।তার ডাক নাম কৌশিক। বাইকপ্রিয় মর্তুজাকে সবাই খুব হাসিখুশি আর উদারচেতা মানুষ হিসেবেই জানে। প্রায়শঃই তিনি বাইক নিয়ে স্থানীয় ব্রিজের এপার-ওপার চক্কর মেরে আসেন। নিজের শহরে তিনি প্রচণ্ড রকমের জনপ্রিয়। এখানে তাকে "প্রিন্স অব হার্টস" বলা হয়। এ শহরেরই সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজে পড়ার সময় সুমনা হক সুমির সাথে তার পরিচয় হয়। দু'জনে ২০০৬ সালে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হোন।

আক্রমণাত্মক, গতিময় বোলিং দিয়ে অনূর্ধ-১৯ দলে থাকতেই তিনি ওয়েস্ট ইন্ডিজ সাবেক ফাস্ট বোলার অ্যান্ডি রবার্টসের নজর কেড়েছিলেন, যিনি কিনা তখন দলটির অস্থায়ী বোলিং কোচের দায়িত্বে ছিলেন। রবার্টসের পরামর্শে মাশরাফিকে বাংলাদেশ এ-দলে নেয়া হয়।


৮ নভেম্বর ২০০১, ভাগ্যের চাকা যেন খুলে গেল ছোট্ট মাশরাফির। বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে প্রতিপক্ষ জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বল হাতে নামতে হবে তাকে। জীবনের প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ তাও আবার টেস্ট!

একটু ভয় পাওয়াই স্বাভাবিক। কারন প্রতিপক্ষ দলে এন্ড্রু ফ্লাওয়ার, গ্রান্ট ফ্লাওয়ার, ক্রেইগ উইশার্ট এর মত মস্তবড় ব্যাটসম্যান রয়েছে পাশাপাশি বল হাতে হিথ স্ট্রিক তো আছেই। মাশরাফি ভীতু নন, উদ্দাম সাহস নিয়ে ১৯ তম টেস্ট ক্যাপ পরে সবুজ গালিচায় নেমে পড়লেন সঙ্গে খালেদ মাহমুদ সুজনেরও অভিষেক ঘটলো। জীবনের প্রথম ইনিংসে ব্যাট হাতে ২২ বলে ৮ রান করে হিথ স্ট্রিক এর বলে এন্ড্রু ফ্লাওয়ারের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফিরলেন সাজঘরে। পরে বল হাতে পেলেন সাফল্য ৩২ ওভারে ৮ মেডেন ১০৬ রান দিয়ে নিলেন ৪ উইকেট! ফলাফল ম্যাচ ড্র।মজার ব্যাপার হল, মাশরাফির প্রথম ফার্স্ট ক্লাস ম্যাচও ছিল এটি। তিনি এই বিরল কৃতিত্বের অধিকারী ৩১তম খেলোয়াড় এবং ১৮৯৯ সালের পর তৃতীয়। একই বছর ২৩শে নভেম্বর ওয়ানডে ক্রিকেটে মাশরাফির অভিষেক হয় ফাহিম মুনতাসির ও তুষার ইমরানের সাথে। অভিষেক ম্যাচে মোহাম্মদ শরীফের সাথে বোলিং ওপেন করে তিনি ৮ ওভার ২ বলে ২৬ রান দিয়ে বাগিয়ে নেন ২টি উইকেট।

তিনি একজন ডানহাতি ব্যাটসম্যান। তার বোলিংয়ের ধরণ ডানহাতি পেস বোলার। বাংলাদেশ জাতীয় দল ছাড়াও তিনি এশিয়ান একাদশের একদিনের আন্তর্জাতিক দলে খেলেছেন। ১৪ বছরের ক্যারিয়ারে ১১ বার চোটের কারণে দলের বাইরে যেতে হয়েছে মাশরাফিকে। চোটই তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিল ২০১১ সালের দেশের মাটিতে বিশ্বকাপ। চোটের কারণে অপারেশন টেবিলে তাকে যেতে হয়েছে সাতবার।

টাকার জন্য খেলেননা মাশরাফি বরং দেশের জন্যই মরিয়া হয়ে খেলেন। এমনও দিন গেছে যে ব্যাথার ইনজেকশন নিয়েই মাঠে নেমে গেছেন শিশুসুলভ মাশরাফি।

একদিন মাশরাফি বলেছিলেন ” জীবনে যে টাকা আমি আয় করেছি সে টাকা দিয়ে আমার ছেলেমেয়েরাও পর্যন্ত বসে খেতে পারবে, আমি দেশের জন্য ক্রিকেট খেলি, আমি আরো অনেক দিন ক্রিকেট খেলতে চাই দেশের স্বার্থে “
২০০৭ সালের বিশ্বকাপের সময় ভারতের যুবরাজের একটি কথা মনে পড়ে, ” ২০০৭ এর বিশ্বকাপে আমরা যখন সবাই এটাই আমাদের মাশরাফি। যার মত ক্রিকেটার বারবার এদেশে আসেনা, যুগে যুগে একজনই আসে। সন্মান জানই তার প্রতি হাজার সালাম।  মোহাম্মাদ রফিকের বোলিং নিয়ে ভাবছিলাম আর দলে খুব গবেষণা চলছিল তখন শচিন বলেছিল মাশরাফির উপরও নজর রাখতে হবে,ও ভয়ংকর । তখন ভাবিনি এতোটা ভয়ংকর “। সৌরভ গাঙ্গুলী বলেছিলেন “ইশ! আমাদের যদি একটি মাশরাফি থাকতো! “

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ক্রিকেটের যে আন্তর্জাতিক সাফল্য তার নিউক্লিয়াস মাশরাফি। সতীর্থদের আগলে রেখেছেন বড় ভাই সুলভ মানসিকতা দিয়ে। এক সুতোয় বেঁধে রেখেছেন পুরো দলকে। সর্বোপরি বাংলাদেশের ড্রেসিংরুমকে একটা শান্তির জায়াগা  হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন মাশরাফি।

নায়কেরা বিখ্যাত হয়, স্ট্যাটাস মেনে চলেন। মেপে কথা বলেন। লাল নীল কাপড় পরে কল্পনার নায়কেরা আকাশে উড়েন।
মহানায়কেরা? তারা মনে হয় মাশরাফি হন। জাতীয় দলের ২ নাম্বার জার্সিটা পড়ে কলারটা উচু করেন। ছোট বড় আধাশত ইনজুরীর পরে নিজেকে বলেন- এ আর এমন কী? দৌড়া পাগলা দৌড়া। মিরপুরে হোওওওওওওওও করে রব উঠে। আমরা আশায় থাকি। ঐ তো কৌশিক দৌড়াচ্ছে। আবার স্ট্যাম্প উড়বে।

আলোকিত সিরাজগঞ্জ
আলোকিত সিরাজগঞ্জ
পাঠকের চিন্তা বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর