• মঙ্গলবার   ০২ জুন ২০২০ ||

  • জ্যৈষ্ঠ ১৯ ১৪২৭

  • || ১০ শাওয়াল ১৪৪১

৫১

জ্বর হলেই করোনা নয় (পর্ব-৩)

আলোকিত সিরাজগঞ্জ

প্রকাশিত: ১৬ মার্চ ২০২০  

নভেল করোনা-১৯ ভাইরাস সংক্রমন থেকে যেভাবে রক্ষা পেতে পারেন :

(১) প্রতিদিন কয়েকবার করে কব্জি পর্যন্ত দুই হাতে সাবান মেখে পানি দিয়ে কিংবা অ্যালকোহল বেজড হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে দুই হাত সঠিকভাবে (আঙ্গুলের ভেতরে আঙ্গুল ঢুকিয়ে ভালো করে কচলিয়ে এবং দু’হাতের সবটুকু জায়গা) হাত ধুতে হবে। এর ফলে যদি হাতের তালুতে ভাইরাস লেগে থাকে, তবে তা মরে যাবে।

হ্যান্ড স্যানিটাইজারে অ্যালকোহলের পরিমান কমপক্ষে ৬০% হতে হবে। নন-অ্যালকোহল বেজড হ্যান্ড স্যানিটাইজারে এই ভাইরাস মরবে না। যদি কোনো কারণে ধারে-কাছে সাবান বা হ্যান্ড স্যানিটাইজার না থাকে, তাহলে অন্তত পানি দিয়ে আঙ্গুল কচলিয়ে ভালো করে কব্জি পর্যন্ত হাত ধোবেন। কলুষিত কোনো কিছু স্পর্শ করার পরেও ভালো করে হাত ধুতে হবে। বাইরে থেকে ঘরে ফিরে অবশ্যই হাত ধোবেন।

(২) হাঁচি-কাশিতে আক্রান্ত ব্যক্তির থেকে কমপক্ষে তিন ফুট দূরত্ব বজায় রাখুন। এর ফলে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীর নিঃসৃত ভাইরাসবাহী ড্রপলেটগুলো সহজে আপনার নাকে-মুখে প্রবেশ করতে পারবে না।

(৩) হাত দিয়ে বারবার নিজের চোখ, নাক ও মুখ স্পর্শ করবেন না। কারণ নভেল করোনা-১৯ ভাইরাস দূষিত (কন্টামিনেটেড) বিভিন্ন পৃষ্ঠতল (সারফেস) স্পর্শ করার ফলে আপনার হাতের তালুতে নভেল করোনা-১৯ ভাইরাস লেগে থাকতে পারে, যা পরে চোখ, নাক বা মুখ দিয়ে আপনার শরীরে প্রবেশ করতে পারে।

(৪) প্রতিবার হাঁচি বা কাশি দেবার সময় হাতের কনুইয়ে বা টিস্যু পেপার দিয়ে মুখ ঢাকুন। ব্যবহারের পরে টিস্যু পেপারটি ডাস্টবিনে ফেলে দিন। হাঁচি-কাশি দেবার সময় হাতের তালু দিয়ে মুখ ঢাকবেন না। সেক্ষেত্রে অন্যের সঙ্গে হাত মেলানোর সময় কিংবা ভাইরাস কলুষিত হাত দিয়ে পরবর্তীতে কিছু স্পর্শ করলে, আপনার হাতের তালু থেকে সেখানে ভাইরাসটি ছড়াতে পারে।

(৫) নিয়মিত ঘরের দরজা, সিড়ির রেলিং, মোবাইল ফোনের স্ক্রিন এবং যেসব স্থান ঘনঘন স্পর্শ করা হয়, সেগুলো জীবানুনাশক ব্যবহার করে নিয়মিত পরিষ্কার রাখুন।

(৬) বেশি করে ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার যেমন কাঁচা মরিচ, লেবু, পেপে, কমলা, সরিষা শাক, ইত্যাদি খান। এর কারণ হলো- ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে।

(৭) নভেল করোনা-১৯ ভাইরাস সংক্রান্ত সঠিক তথ্যের জন্য নিয়মিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং স্বাস্থ্য অধিদফতরের ওয়েবসাইট ভিজিট করুন। ফেসবুকে যা দেখবেন, তাই বিশ্বাস করবেন না, অন্যের ইনবক্সে ফরোয়ার্ড করবার আগে কয়েকবার ভাববেন।

আপনার জ্বর-কাশি বা ঠাণ্ডা লাগলে যা করবেন :

জ্বর-কাশি বা ঠাণ্ডাজনিত অসুস্থতায় সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত ঘরে অবস্থান করুন। যদি আপনার জ্বর, কাশি এবং শ্বাসকষ্ট থাকে, তাহলে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সম্ভব হলে আগে ফোনে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় পরামর্শ নিন। 
বাংলাদেশে আইইডিসিআরের অনেকগুলো হটলাইন নম্বর দেয়া আছে। নভেল করোনা-১৯ ভাইরাস সংক্রান্ত যে কোনো তথ্য ও পরামর্শের জন্য এসব ফোন নম্বরেও কথা বলা যেতে পারে। জাতীয় এবং স্থানীয় পর্যায়ের স্বাস্ব্য কর্তৃপক্ষের পরামর্শগুলো মেনে চলুন।

নভেল করোনা-১৯ ভাইরাসে আক্রান্ত লোকের সংস্পর্শে এলে বা আক্রান্ত এলাকা থেকে আসার পরে যা করবেন :

প্রথমত, উপরে বর্ণিত করণীয়গুলো নিয়মিতভাবে পালন করুন। এবার একটা সত্যি ঘটনা বলি। কদিন আগে বিখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী ফারহাদের (ছদ্মনাম) সঙ্গে তার এক তরুণী ভক্ত দেখা করতে এসেছিলেন। বেশ কিছুক্ষণ তারা একসঙ্গে ছিলেন। দেখার শুরুতে হ্যান্ডশেক এবং যাবার সময় ভক্তের সঙ্গে আলিঙ্গনও করেছেন। দু’দিন পরে ফোন করে ফারহাকে ভক্তটি জানালেন, তার নভেল করোনা-১৯ ভাইরাস পজিটিভ হয়েছে এবং কোভিড-১৯ রোগের লক্ষণ দেখা দিয়েছে। ফোন পাবার পর নিজের মেয়ে দু’টিকে আত্মীয়ের বাসায় পাঠিয়ে পরবর্তী চৌদ্দদিন তিনি নিজ গৃহে স্বেচ্ছা নির্বাসনে থাকলেন। এসময়ে তিনি বাইরে বের হননি, বাসায়ও কাউকে আসতে দেননি। অফিসসহ প্রয়োজনীয় সব কাজ ফোনে আর ইমেইলে সেরেছেন। চৌদ্দদিন পরেও তিনি অসুস্থ বোধ করেননি, তার রক্ত পরীক্ষায়ও নভেল করোনা-১৯ ভাইরাস পাওয়া যায়নি।

আরেকটি ঘটনার কথা বলি। জনৈক ব্যবসায়ী এক বিদেশির সঙ্গে মিটিং করার পর কদিন পর থেকেই জ্বর ও প্রচণ্ড গলা ব্যথা শুরু হলো। খোঁজ নিয়ে জানা গেলো, বিদেশির শরীরেও নভেল করোনা-১৯ ভাইরাস পাওয়া গেছে এবং তিনিও কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়েছেন। ফোনে ডাক্তারের পরামর্শমতো ব্যবসায়ী লোকটি প্যারাসিটামল আর এন্টিহিস্টামিন ট্যাবলেট খেলেন। চৌদ্দদিন ঘরে নিজের রুমে স্বেচ্ছা নির্বাসনে কাটালেন। অসুস্থতার এই সময়ে অনেকগুলো সিনেমা দেখলেন, বই পড়লেন। চৌদ্দদিনের মধ্যে তিনি পুরোপুরি সুস্থও হয়ে উঠেছেন।

নভেল করোনা-১৯ ভাইরাসটি নতুন, তাই এ সংক্রান্ত অনেক প্রশ্নের উত্তরই আমাদের এখন পর্যন্ত জানা নাই। আপাতত প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আক্রান্ত বা সন্দেহজনক ১৪ দিনের এই স্বেচ্ছা নির্বাসনকেই গ্রহণযোগ্য পরামর্শ বলেই আমরা মেনে নিচ্ছি। এর কারণ হলো, কারো শরীরে এই ভাইরাসটি প্রবেশ করলে দুই থেকে ১৪ দিনের মধ্যেই কোভিড-১৯ রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে। চলবে...

উল্লেখ্য পরবর্তী পর্বটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই পর্বে সরকার ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে করণীয় বিষয়ে লিখব। পরের পর্বটি বিশেষভাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য।

লেখক: প্রফেসর, পাবলিক হেলথ বিভাগ, নর্দান ইউনিভার্সিটি ও চেয়ারম্যান, ফাউন্ডেশন ফর ডক্টরস সেইফটি অ্যান্ড রাইটস

আলোকিত সিরাজগঞ্জ
আলোকিত সিরাজগঞ্জ
স্বাস্থ্য বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর