• মঙ্গলবার   ০৭ এপ্রিল ২০২০ ||

  • চৈত্র ২৩ ১৪২৬

  • || ১৩ শা'বান ১৪৪১

১৮

চলনবিলের কৃষি ও মৎস্য সম্পদ খুলে দিতে পারে এঅঞ্চলের মানুষের ভাগ্য

আলোকিত সিরাজগঞ্জ

প্রকাশিত: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

শত বছরের বিবর্তনে উত্তর জনপদের মৎস্য ও শস্য ভান্ডার খ্যাত চলনবিল মরা খালে পরিণত হতে চলছে। হারিয়ে ফেলেছে তার চিরচেনা রূপ, যৌবন আর ঐতিহ্য। শুষ্ক মৌসুমের আগেই বিল নদী খাড়ি শুকিয়ে জেগে উঠেছে দিগন্ত   বির্স্তীর্ন মাঠ। সেই মাঠে এখন রসুন, পেঁয়াজ, সরিষা, মিষ্টি কুমড়া, গাজর, লাউ, সিমসহ নানা প্রকার শীতকালীন শাক সবজির আবাদ হচ্ছে।

চলনবিলে উৎপাদিত শাকসবজি, মধু, কাঁকড়া, শুঁটকি ও কুচিয়া মাছ চাষ দেশের চাহিদা মিটিয়ে থাইংল্যান্ড, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের অনেক দেশে রফতানি  করা হচ্ছে। চলনবিলে উৎপাদিত কৃষি পণ্য ও মৎস্যসম্পদ এ অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করেছে।

বর্ষা মৌসুমে চলনবিলে শুধু পানি আর পানি চোখে পড়ে। আর শুষ্ক মৌসুমে সমগ্র বিলাঞ্চল থাকে শুষ্ক। খাল খনন করে পানি নিষ্কাশনের ফলে শুষ্ক মৌসুমে বিলে পানি চোখে পড়ে না। প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত মাছের পরিবর্তে বিলে এখন অসংখ্য পুকুর কেটে বিদেশী হাইব্রিড মাছের সাথে কুচিয়া মাছ চাষ করা হচ্ছে।

নদী বিল শুকিয়ে যাওয়া দিগন্ত  বিস্তৃত মাঠে ধান, পাট, সরিষা, রসুন, পেঁয়াজ, তরমুজ, বাঙ্গি, মরিচ, গাজর, সিম, কপি, আলু, পটল, লাউসহ নানা প্রকারের ফসল আবাদ হচ্ছে। সবজির ব্যাপারীরা প্রতিদিন এ অঞ্চলের  হাট, মির্জাপুর , ছাইকোলা , মহিশলুটি হাটসহ ১২টি হাটবাজার থেকে লাউ, আলু, সিম, বেগুন, গাজর, কপি, টমেটোসহ বিভিন্ন প্রকার শাকসবজি কিনে ট্রাকে করে রাজধানী  ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়ে যাচ্ছেন। রফতানিকারকরা ঢাকা থেকে বিমানে সবজি আমেরিকা, ইংল্যান্ড, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ইরাকসহ অনেক দেশে রফতানি করছেন।

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ৩৬৮ কিলোমিটার আয়তনের বিস্তৃর্ণ চলনবিল অঞ্চল অর্থনৈতিকভাবে হয়ে উঠতে পারে বিপুল সম্ভাবনাময়। এ অঞ্চলের উৎপাদিত মাছ, মধু এবং সরিষা ভোজ্যতেলের ঘাটতি পূরণে অনেকাংশে সক্ষম হয়েছে। পরিকল্পিত পদ্ধতিতে বোরো ধানসহ অন্যান্য ফসল আবাদ করে দেশের খাদ্যঘাটতি নিরসনে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। চলনবিলে এখন বাণিজ্যিকভাবে কুচিয়া মাছ চাষ করা হচ্ছে।  কুচিয়া মাছ এবং কাঁকড়া চিনে রফতানি করা হচ্ছে। গবাদিপশু, হাঁস, মুরগি, মৌমাছি পালন, শামুক, কাঁকড়া, চিংড়ি চাষের মাধ্যমে এ অঞ্চলের চাষিরা তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা আরো চাঙ্গা করে তুলতে পারেন। এভাবেই চলনবিল খুলে দিতে পারে সমৃদ্ধির অপার সম্ভাবনার দ্বার।

জানা যায়, নাটোর জেলার বড়াইগ্রাম, গুরদাসপুর, সিংড়া, নওগাঁ জেলার রানীনগর, আত্রাই, সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশ, রায়গঞ্জ, উল্লাপাড়া, পাবনা জেলার চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর, বেড়া এবং বগুড়া জেলার দক্ষিণাঞ্চল মিলে চলনবিলের অবস্থান ছিল। কিন্তু ১৯১৪ সালে ঈশ্বরদী-সিরাজগঞ্জ রেলপথ স্থাপনের পর থেকে রেলপথের উত্তর ও পশ্চিম অংশকেই চলনবিল বলা হয়। এম এ হামিদ টিকে ১৯৬৭ সালে ‘চলনবিলের ইতিকথা’ বইতে লিখেছেন, তখন থেকে প্রায় ১৪০ বছর আগে অর্থাৎ ১৮২৭ সালে জনবসতি এলাকা বাদ দিয়ে চলনবিলের জলময় অংশের আয়তন ছিল ৫০০ বর্গমাইলের ওপরে। ১৯০৯ সালে চলনবিল জরিপ কমিটির রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, তৎকালে বিলের আয়তন ছিল ১৪২ বর্গমাইল। এর মধ্যে ৩৩ বর্গমাইল এলাকায় সারা বছর পানি জমে থাকত। ওই রিপোর্টে বলা হয়, চলনবিল তার পানির স্রোতধারা ও নাব্যতা হারিয়ে ক্রমে সঙ্কুচিত হয়ে পড়ছে।

কার্তিক- অগ্রহায়ণ মাসে চলনবিল অঞ্চলের পানি নেমে গেলে সমতল ভূমি জেগে ওঠে। তখন ওই সমতল ভূমি বা জমিতে চাষ হয় সরিষা, রসুন, কালাই, ধান, লাউ, কপি, আনাজ, গাজর, বেগুন, শসা, ক্ষিরাসহ নানা প্রকার রবি ফসল। এরপর এলাকার কৃষকেরা প্রস্তুতি নেয় বোরো ধান চাষে। পৌষ-মাঘ মাসেই ধানের চারা লাগানোর কাজ শেষ হয়ে যায়। কৃষি উৎপাদনে সেচের জন্য কৃষকরা ব্যবহার করছেন ভূগর্ভের পানি। বৈশাখ মাসেই ধান কাটা শুর হয়। শুধু ধানই নয়, অপেক্ষাকৃত উঁচু জমিতে আবাদ হয় নানা প্রকার শাকসবজি। এ অঞ্চলের মাছ, সরিষা, মধু উৎপাদনসহ নানা প্রকার মৌসুমি ফসল ফলছে। তবে উৎপাদিত পণ্যের যথাযথ সংরক্ষণ ও বিপণন ব্যবস্থার অভাবে প্রতি বছর চাষিরা উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

মৎস্য চাষিরা জানিয়েছেন, দেশের সর্ববৃহৎ জলাভূমি চলনবিল এলাকার প্রায় ২০ লাখ মানুষ বছরে প্রায় পাঁচ মাস বেকার জীবনযাপন করেন। বর্ষাকালে এই এলাকার কৃষি জমি পানিতে ডুবে যায়। তাদের হাতে কোনো কাজ থাকে না। এ সময় অনেকে মাছ ধরার পেশায় আত্মনিয়োগ করেন। কিন্তু একসময়ের মৎস্যভার খ্যাত চলনবিলে এখন পর্যাপ্ত মাছ পাওয়া যায় না। এ অঞ্চলে ক্ষুদ্র কুটির শিল্প স্থাপন করে বেকারদের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করা হলে গ্রামীণ অর্থনীতি নতুন জীবন পাবে। সেই সাথে উৎপাদিত কুঠির শিল্পজাত দ্রব্য জাতীয় অর্থনীতির বিকাশ সাধনে গুরত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, বোরো মৌসুমে চলনবিল অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ ধান উৎপাদন করে দেশে খাদ্য ঘাটতি বহুলাংশে পূরণ করা সম্ভব। সুষ্ঠু পানি নিষ্কাশন ও সেচের ব্যবস্থা, বাঘাবাড়ী-নিমাইচড়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ পুনর্র্নিমাণ করা হলে চলনবিল অঞ্চলের কৃষকদের ধান উৎপাদনের পরিমাণ বাড়বে। এতে কৃষকরা ব্যাপকভাবে লাভবান হবেন। চলনবিলের কৃষকদের কৃষির পরেই জীবিকার অন্যতম উৎস হিসেবে ধরা হয় মাছ চাষকে। কিন্তু এক শ্রেণীর মধ্যসাবত্ত ভোগীদের দাপটে জলমহালের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিল পাড়ের প্রায় দেড় লাখ মৎস্যজীবীর জীবনে নেমে এসেছে চরম অনিশ্চয়তা। মৎস্যভার নামে পরিচিত চলনবিলে এখুনো গড়ে ওঠেনি  হিমাগার।

আলোকিত সিরাজগঞ্জ
আলোকিত সিরাজগঞ্জ
সিরাজগঞ্জ বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর