• বৃহস্পতিবার   ২২ এপ্রিল ২০২১ ||

  • বৈশাখ ৯ ১৪২৮

  • || ১১ রমজান ১৪৪২

কিশোর-মুশতাকের জামিন নাকচ যে কারনে : একই চক্রে তাসনিম খলিল-সামি

আলোকিত সিরাজগঞ্জ

প্রকাশিত: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১  

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের এক মামলায় কারাগারে যাওয়ার পর লেখক মুশতাক আহমেদ ও কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোর ছয়বার আবেদন করেও আদালত থেকে জামিন পাননি। এর মধ্যে পাঁচবার বিচারিক আদালতে এবং একবার হাইকোর্টে তাদের জামিন আবেদন নাকচ হয়।

তবে এ মামলায় কারাগারে যাওয়া আরেক আসামি রাজনৈতিক সংগঠন রাষ্ট্রচিন্তার সদস্য দিদারুল ইসলাম ভূঁইয়া জামিন পেতে তিনবার আবেদন করেন বিচারিক আদালতে। এরপর তিনি হাইকোর্টে আবেদন করে জামিনে মুক্তি পান। এ ছাড়া আরেক আসামি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সাবেক পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন গ্রেপ্তারের চার মাস পর বিচারিক আদালত থেকেই জামিন পান।

কারাবন্দি লেখক মুশতাক আহমেদ বৃহস্পতিবার মারা যাওয়ার পর এই মামলায় তার ও কিশোরের জামিন না পাওয়ার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

মুশতাক, কিশোর ও দিদারসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে গত বছরের মে মাসে রমনা থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করে র‌্যাব। অন্য আট আসামি হলেন নেত্র নিউজের এডিটর-ইন-চিফ তাসনিম খলিল, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সাবেক পরিচালক মিনহাজ মান্নান, যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সাংবাদিক শাহেদ আলম, জার্মানিপ্রবাসী ব্লগার আসিফ মহিউদ্দিন, হাঙ্গেরিপ্রবাসী জুলকারনাইন সায়ের খান (সামি), আশিক ইমরান, স্বপন ওয়াহিদ ও ফিলিপ শুমাখার।

মামলার অভিযোগে বলা হয়, এই ১১ জন দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে জাতির জনক, মুক্তিযুদ্ধ, করোনাভাইরাস মহামারি সম্পর্কে গুজব রটিয়ে রাষ্ট্র ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছেন। এ ছাড়া তারা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে জনসাধারণের মধ্যে অস্থিরতা ও বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন।

মামলার পরপরই গ্রেপ্তার করে মুশতাক, কিশোর, দিদার ও মিনহাজকে কারাগারে পাঠানো হয়।

এই চারজনের জামিন আবেদন এবং মুশতাক ও কিশোরের মুক্তি না পাওয়ার কারণ জানতে রাষ্ট্রপক্ষ ও বিবাদীপক্ষের একাধিক আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ রাষ্ট্রপক্ষ উপস্থাপন করতে না পারায় সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকেই মিনহাজ মান্নানকে জামিন দেন ঢাকার মহানগর হাকিম মোর্শেদ আল মামুন ভূঁইয়া। সম্প্রতি রমনা থানা পুলিশ আদালতে জমা দেয়া অভিযোগপত্রেও মিনহাজকে অব্যাহতি দেয়ার সুপারিশ করেছে।

গ্রেপ্তার বাকি তিন আসামির কেউই বিচারিক আদালতে আবেদন করে জামিন পাননি। এরপর তারা যান হাইকোর্টে।

হাইকোর্টে কেবল দিদারের জামিন

বিচারিক আদালতে তিনবার আবেদন করে জামিন পেতে ব্যর্থ হয়ে হাইকোর্টে যান রাষ্ট্রচিন্তার সদস্য দিদারুল। এরপর গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর তাকে ছয় মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেয় বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের বেঞ্চ।

দিদারের পক্ষে হাইকোর্টে শুনানি করা আইনজীবী হাসনাত কাইয়ূম বলেন, এফআইআরে দিদারের বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো অভিযোগ ছিল না। এ বিষয়টি আমলে নিয়ে জামিন দেয় হাইকোর্ট।

আদালত কোন বিবেচনায় জামিন দিয়েছে, জানতে চাইলে দিদারুল ইসলাম বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ ছিল না। আমি কোনো আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেইনি কোথাও।’

তিনি বলেন, ‘আমাকে নিয়ে বলা হয়েছিল যে, আমি মামলার দুই নম্বর আসামি। আমি মুশতাকের পরিচিত। আমার মুশতাকের মধ্যে অনেক আলাপ হয়। আর এই সবের আড়ালে আমি ষড়যন্ত্র করি। তবে তারা (রাষ্ট্রপক্ষ) এর স্বপক্ষে কোনো আলাপের প্রমাণ বা স্ক্রিনশট দিতে পারেনি। কোনো সুনির্দিষ্ট কিছু ছিল না।

‘আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি। আমার বিরুদ্ধে যে ছয়জন সাক্ষী তাদের মধ্যে পাঁচজন একই কথা বলেন।’

এ মামলায় লেখক মুশতাক আহমেদ ও কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোরের জামিন আবেদন পাঁচবার নাকচ হয় বিচারিক আদালতে। এরপর তারাও হাইকোর্টে জামিন চেয়ে আবেদন করেন, তবে দুজনের আবেদন সেখানেও নাকচ হয়।

বিচারপতি রেজাউল হক ও বিচারপতি মো. আতাউর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চে ওই জামিন আবেদনের সময় মুশতাক ও কিশোরের আইনজীবী ছিলেন জেড আই খান পান্না।

তিনি বলেন, ‘মাস দুয়েক আগে মুশতাক ও কিশোরের হাইকোর্টে জামিন চেয়ে আবেদন করেছিলাম। আদালত আমাদের আবেদনটি খারিজ করে দেয়। তারা যে কার্টুন করেছে তাতে জাতির পিতাকে বিকৃত করা হয়েছে, এমন মনে করে আদালত আবেদন খারিজ করেছিল।’

মুশতাক ও কিশোরের বিষয়ে হাইকোর্ট থেকে জামিন পাওয়া দিদারুল বলেন, ‘সবার নামেই আলাদা আলাদা অভিযোগ ছিল। একই মামলা, তবে বলা হয়েছে আমরা সবাই মিলে ষড়যন্ত্র করেছি। এক নম্বর আসামি কিশোরকে নিয়ে কিছু স্ক্রিনশট ছিল। মুশতাকের কিছু কনভারসেশনের স্ক্রিনশট ছিল। আমার ক্ষেত্রে কোনো স্ক্রিনশট ছিল না। মামলার চার নম্বর আসামি মিনহাজ মান্নানের সবার আগে জামিন হয়। উনার জামিনের ১৫ থেকে ২০ দিন পর আমার জামিন হয়।’

সবশেষ ২৩ ফেব্রুয়ারি মুশতাকের জামিন নাকচের তথ্য সঠিক নয়

মুশতাক ও কিশোরের জামিন আবেদন হাইকোর্টে নাকচ হয় প্রায় দুই মাস আগে। এরপর আরেক বেঞ্চে তাদের জামিনের আবেদন করেন আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। সেটি শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।

জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, ‘আমি জানুয়ারি থেকে মামলার দায়িত্ব নিয়েছি। নতুন জামিন আবেদনটি আদালতের তালিকায় অনেক পেছনে থাকায় শুনানি হতে সময় লাগছে। আশা করেছি আগামী সপ্তাহে হাইকোর্টে শুনানি হবে।’

তিনি বলেন, ‘অনেকেই ভুলভাবে রিপোর্ট করছে, ২৩ তারিখে নিম্ন আদালতে তার (মুশতাক) জামিন চাওয়া হয়েছিল। আসলে ওইদিন কোনো জামিন আবেদন ছিল না। মামলাটিতে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ থাকায় ওই দিন মূলত সম্পূরক চার্জশিট দাখিল করার কথা ছিল। ২৩ ফেব্রুয়ারি যারা জামিন চাওয়ার কথা বলছেন তারা আসলে ভুল বলছেন।’

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ওই মামলায় গত ৪ ফেব্রুয়ারি আদালতে অভিযোগপত্র দেয় রমনা থানা পুলিশ। তবে সেখানে সুইডেনপ্রবাসী সাংবাদিক তাসনিম খলিল ও আল জাজিরায় সাক্ষাৎকার দিয়ে বিতর্কিত জুলকারনাইন সায়ের খানসহ (সামি) আট আসামির নাম না থাকায় আদালত অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেয়।

ডিএমপির সাইবার ক্রাইম ইউনিটকে এই তদন্ত করে ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রতিবেদন দিতে বলেছিলেন বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক আসসামছ জগলুল হোসেন।

হাইকোর্টে তিনজনের মধ্যে দিদারের জামিন হলেও কিশোর ও মুশতাকের কেন হলো না জানতে চাইলে ব্যরিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, ‘এটা তো বলা মুশকিল। দিদারের বিষয়টি নিয়ে হাইকোর্টে আবেদন করেছিলাম। আর দিদারের বিরুদ্ধে এফআইআরে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ ছিল না। অন্য দুজনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহী কার্যকলাপ, সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করা- এ সমস্ত বিষয় ছিল।’

কী বলছে রাষ্ট্রপক্ষ

মহানগর আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর তাপস পাল বলেন, ‘আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে জাতির জনক, মহান মুক্তিযুদ্ধ ও রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বা সুনাম ক্ষুন্ন করার চেষ্টা করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে এমন প্রমাণ রয়েছে। কাজেই আদালতে তাদের জামিনের বিরোধিতা করা হয়েছে। এটা বিবেচনায় নিয়ে আদালত তাদের জামিন দেয়নি।’

আলোকিত সিরাজগঞ্জ
আলোকিত সিরাজগঞ্জ