• শনিবার   ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০ ||

  • আশ্বিন ১১ ১৪২৭

  • || ০৯ সফর ১৪৪২

৫১৬

এসএসসির ফরম পূরণের ফি মাত্র ১১ হাজার টাকা!

আলোকিত সিরাজগঞ্জ

প্রকাশিত: ১৩ নভেম্বর ২০১৮  

এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফরম পূরণ বাবদ শিক্ষা বোর্ড টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে। কিন্তু বোর্ডের বেঁধে দেওয়া টাকার চেয়ে অনেক গুণ বেশি (১০ কিংবা ১১ হাজার টাকা) নেওয়ার তথ্য মিলেছে। বিষয়টি কয়েক দিন ধরেই চলছিল। এসব খবরের পরিপ্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে কয়েকটি স্কুলে অভিযানও চালানো হয়েছে। কিন্তু তারপরও বন্ধ হচ্ছে না অতিরিক্ত ফি নেওয়া।

যেসব স্কুলের বিরুদ্ধে এই অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযােগ উঠেছে, তারা বিভিন্নভাবে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ারও চেষ্টা করছে।

সরকার নির্ধারিত টাকার চেয়ে বেশি যারা দিচ্ছে না, তাদের ফরম পূরণ করছে না স্কুল কর্তৃপক্ষ। বিষয়টির প্রতিবাদ করলে উল্টা অভিভাবকদের নানাভাবে ভয়-ভীতি দেখিয়ে হয়রানির অভিযোগ পাওয়া গেছে। আবার কোনো কোনো স্কুল কর্তৃপক্ষ টালি খাতায় বোর্ড নির্ধারিত ফি ও কেন্দ্র ফি ১ হাজার ৮৫০ টাকা তুললেও বাকি টাকার কোনো হিসাব তুলছে না।

বাকি টাকাকে স্কুল কর্তৃপক্ষ কোচিং ফি বলে চালিয়ে দিচ্ছে। তারা এসএসসির ফরম পূরণকারী শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নিচ্ছে। কিন্তু এর বিপরীতে দেওয়া হচ্ছে না কোনো প্রকার রসিদ বা রিসিট। ফলে বিষয়টি প্রমাণ করাও অভিভাবকদের পক্ষে কঠিন হয়ে যাচ্ছে। 

আশকোনা পাবলিক হাই স্কুল 

রাজধানীর উত্তরার অাশকোনা পাবলিক হাই স্কুলের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ পাওয়া যায়। অভিভাবকরা বলছেন, স্কুলটি প্রতি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ফরম পূরণ বাবদ ১০ হাজার টাকা নিচ্ছে। তবে স্কুল কর্তৃপক্ষ সেটাকে দুটি খাতে দেখাচ্ছে। একটি তিন মাসের কোচিং বাবদ ছয় হাজার এবং অারেকটি ফরম পূরণ বাবদ চার হাজার টাকা।

এ স্কুল থেকে এবার এসএসসি পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করবেন তুষ্ট ও তানহা (ছদ্মনাম) নামের ছাত্রী। তারা দুজন বাণিজ্য বিভাগ থেকে অংশ নেবেন। দুজনই ক্লাসের পড়ালেখায় ভালো। তাদের ফরম পূরণ বাবদ দিতে হবে ২০ হাজার টাকা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক অভিভাবক বলেন, ‘অামাদের তো সাধ্য নাই ১০ হাজার টাকা দেওয়ার। স্যাররা তো কোনো কথা শুনতাছে না। বোর্ড নাকি মাত্র ১৬৮৫ টাকা নির্ধারণ করে দিছে। কিন্তু স্কুলের স্যারেরা তো সেটা মানতাছে না। অামার চাইর সন্তান। ২০ হাজার টাকা অামরা ক্যামনে ম্যানেজ করুম, মাথা কাজ করতাছে না। অন্য স্কুলগুলো তো পাঁচ হাজার করি নিতাছে। কিন্তু এ স্কুল তো সেটা মানতাছে না।’

অারেক ছাত্রীর বাবা ফজলুল হক প্রিয়.কমকে বলেন, ‘টাকা নিয়া গেছিলাম। হেড স্যারে কয় ১০ হাজার টাকা ছাড়া নাকি ফরম ফিলাপ করাবি না। তাই ফেরত অাইছি। অাবার কালকে যাতি হবি।’

অভিভাবকদের অভিযোগ, অন্য স্কুলগুলো সরকার নির্ধারিত টাকার চেয়ে কিছু বেশি নিচ্ছে। কিন্তু সে টাকার পরিমাণ সামান্য। অার অাশকোনা পাবলিক স্কুল সে নিয়ম মানছে না। সরকারের নির্ধারিত টাকার চেয়ে ৫ গুণের বেশি টাকা নিচ্ছে। এ ব্যাপারে কোনো অভিভাবক কথা বলতে গেলে নানা যুক্তি দেখানো হচ্ছে। একই সঙ্গে ভয়-ভীতি অার তার সন্তানকে ফরম পূরণ করতে না দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শুক্রবার হাতে গোনা ছাত্র-ছাত্রী ফরম পূরণ করেছেন। অধিকাংশ অভিভাবক ১০ হাজার টাকা দিতে নারাজ। তারা এ টাকা কমানোর জন্য স্থানীয় সরকারদলীয় বিভিন্ন নেতার কাছে ছুটছেন। অার বিষয়টিকে নেতারাও নির্বাচনের অাগে হাতিয়ার হিসেবে নিয়েছেন। কোনো নেতা স্কুলের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগও শুরু করেছেন। কারো কারো টাকা কিছু কম নেওয়ারও তদবির চলমান অাছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, স্কুলটি শুরুর মাত্র তিন বছর হলো। কিন্তু ছাত্র-ছাত্রী প্রায় সাড়ে পাঁচশর মতো হওয়ায় বেতনও বেশি করে নেওয়া হয়। অভিযোগ আছে, এবার প্রধান শিক্ষক ফরম পূরণ বাবদ টাকা নিয়ে একটি ব্যবসা করার ফন্দি এঁটেছেন। এ কারণে অভিভাবকদের কোনো কথাতেই তিনি কর্ণপাত করছেন না। যারা এ পর্যন্ত ফরম পূরণ করেছেন, তাদের কাউকেই রসিদ দেওয়া হচ্ছে না। শুধু টাকার পরিমাণটা খাতায় তুলছেন টাকা তোলার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ছাত্রের অভিভাবক জানান, তিনি তার ছেলের কাছে ফরম পূরণের টাকার পরিমাণ শোনার পর থেকে বড় চিন্তায় পড়েছেন। কারণ তিনি একটি মুদির দোকান চালান। এ অায়ে তিন সন্তানের পড়ালেখা অার সংসারের খরচ জোগাতে তাকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তার ওপর বড় ছেলের ফরম পূরণে ১০ হাজার টাকা তার কাছে ঘাড়ে তুলে দেওয়া পাথরের মতো লাগছে। সে কারণে এ টাকা কীভাবে কমানো যায়, তিনি রাত-দিন স্থানীয় কয়েকজন নেতার বাসায় ফোনে ধরনা দিচ্ছেন। তবে নেতারা তার টাকা কমিয়ে দেবেন, এমন অাশ্বাস এখনো দিতে পারেননি।

নজরুল ইসলাম নামের এক অভিভাবক প্রিয়.কমকে বলেন, ‘অামি অামার ছেলের ফরম এখনো পূরণ করাইনি। তবে শুনছি স্কুল এবার ১০ হাজার টাকা নিচ্ছে। অাসলে তারা চাইলেই তো হবে না। অামাদের মতো মধ্যবিত্তের পরিবারে এত টাকা দেওয়া কী সম্ভব? দেখি, স্যারদের বলে-কয়ে যদি কিছু টাকা কমাতে পারি।’

এবার মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড থেকে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ফরম পূরণের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীপ্রতি সর্বোচ্চ ফি নির্ধারণ করেছে এক হাজার ৮০০ টাকা । গত ৮ নভেম্বর, বৃহস্পতিবার ঢাকা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক তপন কুমার সরকার স্বাক্ষরিত এ বিষয়ে একটি নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। সব বিভাগের জন্যই বিলম্ব ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ১০০ টাকা। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড আলাদা আলাদা বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে।

ঢাকা বোর্ডের জারিকৃত নির্দেশনা অনুযায়ী, বিজ্ঞান বিভাগ চতুর্থ বিষয়সহ ফরম পূরণের ফি এক হাজার ৮০০ টাকা। এর মধ্যে বোর্ড ফি এক হাজার ৩৮৫ এবং কেন্দ্র ফি ৪১৫ টাকা। ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ চতুর্থ বিষয়সহ ফরম পূরণের ফি এক হাজার ৬৮০ টাকা। এর মধ্যে বোর্ড ফি এক হাজার ২৯৫ টাকা ও কেন্দ্র ফি ৩৮৫ টাকা। অন্যদিকে মানবিক বিভাগ চতুর্থ বিষয়সহ ফরম পূরণের ফি এক হাজার ৬৮০ টাকা। এর মধ্যে বোর্ড ফি এক হাজার ২৯৫ টাকা ও কেন্দ্র ফি ৩৮৫ টাকা।

এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অনলাইনে ফরম পূরণের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ থেকে ১২ নভেম্বর পর্যন্ত। তবে বিলম্ব ফি দিয়ে ১৪ থেকে ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত অনলাইনে ফরম পূরণ করা যাবে। অার এ নির্দেশনা না মানা হলে উক্ত স্কুলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

এ ব্যাপারে অাশকোনা পাবলিক হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক কাজী অাবুল কালাম প্রিয়.কমকে বলেন, ‘অামি এই মুহূর্তে একটি জরুরি মিটিংয়ে অাছি, এ বিষয়ে পরে কথা বলব।’ এই বলেই তিনি ফোনের সংযোগ কেটে দেন। পরে তাকে অাবারও ফোন করা হলে তা আর রিসিভ হয়নি।

আলোকিত সিরাজগঞ্জ
আলোকিত সিরাজগঞ্জ