• মঙ্গলবার   ০২ জুন ২০২০ ||

  • জ্যৈষ্ঠ ১৯ ১৪২৭

  • || ১০ শাওয়াল ১৪৪১

১৩

আসছে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের বাজেট

আলোকিত সিরাজগঞ্জ

প্রকাশিত: ১৩ মে ২০২০  

কভিড-১৯-এর প্রভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়া অর্থনীতিকে টেনে তুলতে ইতিমধ্যে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করেছে সরকার। এটাকেও যথেষ্ট মনে করা হচ্ছে না। কেননা কভিড-১৯-এর প্রভাব যে দীর্ঘমেয়াদি হবে তা ইতিমধ্যে পরিষ্কার। অর্থ বিভাগের সূত্রগুলো বলছে, এজন্য অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে আগামী ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এবারের বাজেটের মূল লক্ষ্যই হবে দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার। আর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে স্বাস্থ্য খাত। এটা অবশ্য এখন বিশ্বজুড়েই গুরুত্বের খাত। কেননা কভিড-১৯-এর কাছে সারা বিশ্বই ধরাশায়ী হয়ে নিজ নিজ দেশের স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়াচ্ছে খোদ উন্নত দেশগুলোও। জাতিসংঘ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও এ খাতে গবেষণার পাশাপাশি আর্থিক বরাদ্দ বাড়ানোকে গুরুত্ব দিয়ে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় এবারই প্রথম বাংলাদেশের বার্ষিক বাজেটে স্বাস্থ্য খাতই সর্বাধিক গুরুত্ব পেতে যাচ্ছে। একইভাবে কৃষি খাত ও খাদ্য ব্যবস্থাপনাকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কেননা বিপর্যস্ত বিশ্বের প্রতিটি দেশই নিজ নিজ অভ্যন্তরীণ কৃষি ও শিল্প খাতের উৎপাদনকে এই ধাক্কা সামলানোর একমাত্র পথ বলে মনে করছে। যে দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও চাহিদা যত বেশি সে দেশ তত সহজে এই ধাক্কা সামাল দিতে পারবে বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক। এর ফলে বাংলাদেশেও কৃষিজ উৎপাদনকেই একমাত্র অর্থনীতি চাঙ্গা রাখার প্রধান খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একইভাবে খাদ্য উৎপাদন ও ব্যবস্থাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এবারের বাজেটে। অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার কমিয়ে ধরা হলেও মেগা প্রকল্প, যেমন পদ্মা সেতু, পদ্মা সেতুর রেলসংযোগ প্রকল্প, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, কর্ণফুলী টানেল এসব প্রকল্পে বরাদ্দ কমবে না। তবে প্রতিবছর যে হারে এডিপি বাড়ে এবার তার ব্যতিক্রম ঘটবে। প্রতিবছর এডিপির আকার ১৫ থেকে ১৭ শতাংশ বাড়ানো হয়। এবার সেটা ৩ থেকে ৪ শতাংশের বেশি বাড়বে না বলে জানিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। সেই হিসাবে এবারের বাজেটে মোট এডিপিরি আকার হতে পারে ২ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা। তবে এটা এখনো চূড়ান্ত নয়। সূত্র জানায়, বাজেট বিষয়ে অর্থমন্ত্রী ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছেন। যেখানে এনবিআর, বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও উপস্থিত ছিলেন। সেসব বৈঠকে বাজেটে দেশের বিপর্যস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনার প্রতি জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আপাতত জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে না ভেবে মানুষের জীবন নিয়ে ভাবা বেশি জরুরি বলে মনে করেন তিনি। পাশাপাশি কভিড-১৯-পরবর্তী বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের শ্রমবাজার পুনরুদ্ধার ও রপ্তানির বাজার উন্নয়নে আগাম পরিকল্পনা এখন থেকে ঠিক করারও নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। শুধু তা-ই নয়, মানুষের জীবন ও জীবিকাকে বাজেটের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে গণ্য করে কোনো মানুষ যেন না খেয়ে মারা না যায়, এমনকি কেউই যেন খাদ্য সংকটের মধ্যে না পড়েন সেদিকে খেয়াল রাখছে সরকার। এজন্য চলতি বছরের পাশাপাশি আসছে বছরের পুরো সময় জুড়েই থাকবে সরকারের নানা ধরনের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি। এজন্য এ খাত রেকর্ড পরিমাণ বরাদ্দ বাড়ানো হবে। কৃষকদের নানাভাবে সহায়তা দিতেও থাকবে বিভিন্ন ধরনের নতুন নতুন কর্মসূচি। বাড়বে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা। খাদ্য অধিদফতর ও দুর্যোগ ব্যবস্থানা মন্ত্রণালয় বলছে, এবারের এই কভিড-১৯ সংকটে ইতিমধ্যে দেশের প্রায় চার কোটি মানুষকে খাদ্য সহায়তা দিয়েছে সরকার। এই কর্মসূচি পরের বছরও অব্যাহত থাকবে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে খাদ্য কর্মসূচির আওতায় আনতে নগদ টাকাও দেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে এ খাতের জন্য ১২০০ কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে। এ ধরনের কর্মসূচি আগামী বাজেটেও চালু থাকবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এবং অর্থনীতিবিদ এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘এবারের প্রেক্ষাপটটা তো একেবারেই ভিন্ন। ফলে আগামী বাজেটে রাজস্ব আদায়, ঘাটতি বাজেট মোকাবিলা কীভাবে হবে তা বড় চ্যালেঞ্জ। ঘাটতি বাজেট সব সময় ৫ শতাংশের নিচে রাখার চেষ্টা করা হয়। এবার তা ধরে রাখা একটি চ্যালেঞ্জ। ঘাটতি মোকাবিলায় সঞ্চয়পত্র এবং ব্যাংক থেকে কীভাবে ঋণ নেওয়া হবে তা দেখতে হবে। কারণ সঞ্চয়পত্রে ইতিমধ্যে ধস নেমেছে। ব্যাংকগুলোর অবস্থাও ভালো নয়। ইতিমধ্যে সরকার অনেক ঋণ নিয়েছে। আরও ঋণ নিলে  বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ কমে যাবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ  নেওয়া এবং বৈদেশিক সাহায্য জোগাড় করতে হবে। তবে বিদেশি সাহায্য জোগাড়ও একটি চ্যালেঞ্জ হবে বলে আমি মনে করি।’ সূত্র জানায়, করোনার কারণে তছনছ অর্থনীতি। ব্যবসা-বাণিজ্য রীতিমতো বিপর্যস্ত। থমকে গেছে সব উন্নয়ন কর্মকান্ড। বিনিয়োগ তো  নেই-ই, উল্টো একে একে লে-অফ হচ্ছে শিল্প-কারখানা। পাঁচ কোটি দরিদ্রের সঙ্গে নতুন করে আরও অন্তত আড়াই থেকে তিন কোটি মানুষ দরিদ্র হওয়ার ঝুঁকিতে। আমদানি সীমিত। সবকিছু অচল, তাই নেই রপ্তানিও। বৈশ্বিক লকডাউনে প্রবাসীরাও আছেন অবরুদ্ধ জীবনে। ফলে তাদের আয় নেই। আসছে না রেমিট্যান্স। রপ্তানি ও রেমিট্যান্সে  নেতিবাচক ধারায় টান পড়ার ঝুঁকিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। চলতি বছর (২০১৯-২০) সরকারের রাজস্ব আদায়েও ঘাটতি হতে পারে এক লাখ কোটি টাকা। এ অবস্থায় এবারের বাজেটে সরকারের রাজস্ব নীতি কী হবে। কাদের কাছ থেকে কর আদায় করা হবে, কাদের কর ছাড় দেওয়া হবে- এসব বিষয় নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। তবে ব্যবসা-বাণিজ্যকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দিতে কমতে পারে করপোরেট কর। আর সাধারণ মানুষের কষ্টের কথা চিন্তা নতুন করে কোনো খাতেই কর বাড়াতে চায় না সরকার। তবে কর ফাঁকিবাজদের ধরতে থাকতে পারে বিশেষ কর্মসূচির পরিকল্পনা। এমন পরিস্থিতিতে চলতি বাজেটের বাস্তবায়ন হচ্ছে না ঠিকমতো। এরই মধ্যে কাটছাঁট করা হয়েছে এডিপি ও রাজস্ব আয়। তাও করা হয়েছে করোনার আঘাতের আগেই। এখন পরিস্থিতি আরও নাজুক। বর্তমান বাজেট বাস্তবায়নের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে দরিদ্র মানুষকে খাওয়া-পরা জোগাতে আর অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে। এরই মধ্যে শিল্প, সেবা, এসএমই, কৃষিসহ সামাজিক সুরক্ষায় সরকার প্রায় এক লাখ কোটি টাকার প্যাকেজ দিয়েছে। অর্থাৎ বলা যায়, অর্থনীতির রক্তপ্রবাহ সচল রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করা হচ্ছে। এমনকি উন্নয়ন অধিক গুরুত্বপূর্ণ নয় এমন উন্নয়ন প্রকল্পগুলো থেকে অর্থ কেটে আনা হয়েছে করোনা মোকাবিলার মতো আপৎকালীন খাতে।

জানা যায়, এবারই সম্পূর্ণ ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে বাজেট দিতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী, যা এর আগে কখনই দেখেনি বাংলাদেশ। এবারের চ্যালেঞ্জটাকে একেবারেই নতুন এক চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছে সরকার। ফলে অন্য বছরের ধারাবাহিকতা এবারের বাজেটে পরিলক্ষিত নাও হতে পারে। প্রথমদিকে বাজেটের আকার ৫ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা ধরা হবে এমন পরিকল্পনা করা হলেও তা নিয়ে সরে এসে এ আকার কমিয়ে আনা হচ্ছে। ফলে এবারের বাজেটের মোট আকার হতে পারে ৫ লাখ ৬০ থেকে ৬৫ হাজার কোটি টাকা। আর এডিপির আকার হতে পারে ২ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা। আর আগামী অর্থবছরের বাজেট ঘাটতি দুই লাখ কোটি টাকার বেশি ধরা হতে পারে বলে জানা গেছে।

আলোকিত সিরাজগঞ্জ
আলোকিত সিরাজগঞ্জ
অর্থনীতি বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর