• বৃহস্পতিবার   ১৩ মে ২০২১ ||

  • বৈশাখ ৩০ ১৪২৮

  • || ০১ শাওয়াল ১৪৪২

অ্যারিসিবো: মহাবিশ্বে চিহ্ন রেখে ভেঙে পড়া মানমন্দির

আলোকিত সিরাজগঞ্জ

প্রকাশিত: ১৩ মার্চ ২০২১  

গত বছর নিয়ে একটা কথা খুবই প্রচলিত ছিল, ‘বিষে ভরা বিশ’। ২০২০ সাল সত্যিই বিশ্ববাসীর জন্য দূর্ভিসহ ছিল। সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছিল অ্যারেসিবো টেলিস্কোপ। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ বেতার টেলিস্কোপের গৌরব ধারণ করেছিল অ্যারেসিবো টেলিস্কোপ। গল্পটা এমন এক মানমন্দিরের, যার বার্তা বুকে নিয়ে বেতার তরঙ্গ ছুটে যাচ্ছে পৃথিবী থেকে ২৫ হাজার আলোকবর্ষ দূরের নক্ষত্রপুঞ্জ ক্লাস্টার মেসিয়ার ১৩-এর উদ্দেশ্যে।

মহাকাশ গবেষণা নিয়ে যারা একটু-আধটু খোঁজ রাখেন, তারা জানেন মানমন্দির কোনো ধর্মীয় প্রার্থনাগার নয়। এটি পৃথিবী ও মহাশূণ্য পর্যবেক্ষণ এবং পরিমাপ গ্রহণের জন্য বিশেষভাবে তৈরি অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতিসমৃদ্ধ গবেষণাগার। জ্যোতির্বিজ্ঞান, জ্যোতিষ শাস্ত্র, জলবায়ুবিজ্ঞান, ভূতত্ত্ব ইত্যাদি বিষয়ের গবেষণার জন্যই সাধারণত মানমন্দির স্থাপন করা হয়ে থাকে।

আমরা আকাশ দেখে মহাবিশ্ব কি এবং সেখানে আমাদের অবস্থান সম্পর্কে ধারণা করার চেষ্টা করেছি আর হয়েছি কৌতুহলী। আর সেই কৌতুহল ধীরে ধীরে অন্যান্য প্রাণীদের থেকে আমাদের আালদা করে মানুষ হয়ে উঠতে সাহায্য করেছে। 

সচারচর আমরা আকাশ দেখি খালি চোখে। তাতে ভালোভাবে দেখা যায় না বলেই দূরবীনের জন্ম। সময়ের পালা বদলের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ কৌতুহলী হয়ে উঠেছে অদৃশ্য আলোদের নিয়ে।এদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বেতার তরঙ্গ। এটি অনেক দূরে ছুটে চলে আর সঙ্গে বয়ে নিয়ে চলে গুরুত্বপূর্ণ সব তথ্য। তবে এ ধরনের তরঙ্গদের শনাক্ত করা সহজ নয়। মূলত এর জন্য দায়ী নানা ধরনের শব্দদূষণ।

৩ বছরে বানানো হয় অ্যারেসিবো মানমন্দির

সব ধরনের দূষণই বাধা হয়ে দাঁড়ায় বহুদূর থেকে ছুটে আসা এই বেতার তরঙ্গের সামনে। ফলে এসব তরঙ্গ মৃদু হয়ে বিকৃত হতে থাকে দূষণের সঙ্গে মিশে। বিজ্ঞানীরা ঠিক তখনই এই সমস্যার সমাধানের কথা ভাবেন। এই ভাবনাকে কেন্দ্র করেই ১৯৬০ সালের মাঝামাঝি সময়ে  শুরু হয় অ্যারেসিবো মানমন্দিরের কাজ। শেষ হতে লেগে যায় প্রায় ৩ বছর।

 

১৯৬০ সালের মাঝামাঝিতে অ্যারেসিবো মানমন্দিরের কাজ শুরু হয়। ছবি: সংগৃহীত

১৯৬০ সালের মাঝামাঝিতে অ্যারেসিবো মানমন্দিরের কাজ শুরু হয়। ছবি: সংগৃহীত

 

এই বিশাল ‘ডিশ’ এর ব্যাস এক হাজার এবং গভীরতা ১৬৭ ফুট। এর পৃষ্ঠতল তৈরি হয়েছে ৬ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৩ ফিট প্রস্থের ৩৮ হাজার ৭৭৮ টি  অ্যালুমিনিয়াম প্যানেল দিয়ে। প্রাথমিক রিফ্লেক্টরের পাশাপাশি টেলিস্কোপটিতে আছে দুটি সহকারি রিফ্লেক্টর। এর উপরে ১৮ টি তার দিয়ে ঝুলানো আছে অ্যান্টেনা ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ; যার ওজন ৯০০ টন।

প্রাথমিক রিফ্লেক্টরই অ্যারিসিবোকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এটি মূলত পৃথিবীর সবচেয়ে সংবেদনশীল বেতার টেলিস্কোপ। অন্য কোনো টেলিস্কোপের বেতার তরঙ্গ পর্যবেক্ষণ করতে কয়েক ঘণ্টা লেগে যাবে, অ্যারিসিবো দিয়ে সেই কাজ কয়েকমিনিটের মধ্যেই সেরে ফেলা যায়।

অ্যারিসিবো ৫০ মেগাহার্টজ থেকে ১০ হাজার মেগাহার্টজ পর্যন্ত কম্পাংক নিয়ে কাজ করতে পারে। রিফ্লেক্টর বা প্রতিফলক সিগন্যাল সরাসরি গ্রহণ করে না। তাই প্রয়োজন হয় বিশেষ ধরণের সংবেদনশীল বেতার গ্রাহক যন্ত্র। প্রতিফলকের ওপরে তাই অনেকগুলো অ্যান্টেনা ঝোলানো আছে, এগুলো নিম্নমুখী। অর্থাৎ প্রতিফলক থেকে সিগন্যাল এসব অ্যান্টেনার ভেতর এসে পড়ে।

অ্যান্টেনার একেকটা আবার একেক ফ্রিকোয়েন্সি বা কম্পাঙ্কের তরঙ্গ নিয়ে কাজ করে।আর এই অ্যান্টেনাগুলোর মধ্যেই বসানো আছে বিশেষ ধরনের সংবেদনশীল গ্রাহক যন্ত্র। এই যন্ত্রগুলোকে তরল হিলিয়ামের মধ্যে ডুবিয়ে রাখা হয়েছে। যার উদ্দেশ্য গ্রাহক যন্ত্রগুলোর তাপমাত্রা কম রাখা। যাতে যন্ত্রের মধ্যকার ইলোকট্রনগুলো খুবই কম নড়াচড়া করে। ফলে দূষণ তৈরি হয় খুবই কম। এজন্যই বহুদূর থেকে ছুটে আসা অসম্ভব ক্ষীণ বেতার তরঙ্গকে দ্রুত পর্যাপ্ত পরিমাণ অ্যামপ্লিফাই করা সম্ভব হয়। 

বাইনারি সংখ্যায় লিখা হয় অ্যারিসিবো বার্তা

১৯৬৪ সালের ৭ এপ্রিল গর্ডন পেতেংলির দল এই মানমন্দিরের সাহায্যে নিজের অক্ষকে কেন্দ্র করে ঘুরতে মঙ্গলগ্রহের কতদিন লাগে, তা সঠিকভাবে হিসাব করেন। বিজ্ঞানীরা আগে মনে করতেন এই সময়টা ৮৮ দিন। অ্যারিসিবো থেকে দেখা যায়, এই সময়টা আসলে পৃথিবীর ৫৯ (৫৮.৬৫) দিনের মতো।

 

অ্যারেসিবো মানমন্দির যেন মহাজাগতিক এক স্বপ্নের পরিসমাপ্তি। ছবি: সংগৃহীত

অ্যারেসিবো মানমন্দির যেন মহাজাগতিক এক স্বপ্নের পরিসমাপ্তি। ছবি: সংগৃহীত

 

অ্যারিসিবো বার্তাটি লেখা হয়েছে মূলত বাইনারি সংখ্যায়। অর্থাৎ ০ ও ১ এর মাধ্যমে। ২৩ টি সারি ও ৭৩ টি কলামের মাধ্যমে সাজানো হয়েছে বার্তাটি; যা ৭ টি অংশে বিভক্ত। ক্রমানুযায়ী তালিকা করলে হবে নিচের তালিকার মতো- 

১. একেবারে উপরের অংশে রয়েছে ১ থেকে ১০ পর্যন্ত সংখ্যা অনুভূমিকভাবে।

২. দ্বিতীয় কলামে রয়েছে হাইড্রোজেন, কার্বন, নাইট্রোজেন, ফসফরাসের পারমাণবিক সংখ্যা।এই মৌলিক পদার্থগুলো দিয়েই তৈরি হয় ডিএনএ।

৩. তৃতীয় কলামে রয়েছে ডিএনএ’র নিউক্লিওটাইডগুলোর মধ্যকার সুগার ও বেসগুলার ফর্মুলা।

৪. ডিএনএ’র নিউক্লিওটাইডের সংখ্যা এবং দ্বিসূত্রাকার পেঁচানো আকৃতিটি দেয়া হয়েছে। তবে এখানে দেয়া হয়েছে ভুল বার্তা। ডিএনএ-তে নিউক্লাওটাইডের সংখ্যা সেসময় যেহেতু মনে করা হতো ৪.৩ বিলিয়ন, কাজেই সেই তথ্য এখানে সন্নিবেশিত করা হয়। কিন্তু আধুনিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, এর সংখ্যা মূলত ৩.২ বিলিয়ন।

৫. পঞ্চম কলামে যোগ করা হয়েছে মানুষের আকৃতি। এর বাঁমে দেয়া হয়েছে মানুষের গড় উচ্চতার তথ্য ও ডানে পৃথিবীর তৎকালীন জনসংখ্যা যথাক্রমে ১২৬ মিলিমিটার ও ৪.৩ বিলিয়ন।

৬. ষষ্ঠ কলামে রয়েছে সৌরজগতের আকৃতি। প্রথমে সূর্য, তারপর ক্রমান্বয়ে গ্রগগুলোর আকৃতি বোঝানো হয়েছে। এছাড়া পৃথিবীকে বিশেষভাবে বোঝাতে এর অবস্থানকে এক ঘর উপরে দেয়া হয়েছে। 

৭. সর্বশেষ কলামে রয়েছে প্রেরকের ঠিকানা। মানে অ্যারিসিবো টেলিস্কোপের আকৃতি, ব্যাস ও বার্তাটির তরঙ্গদৈর্ঘ্য। 

গ্যালাক্সির রোটেশন বা নিজ অক্ষকে কেন্দ্র করে ঘোরার তথ্য এবং এর সত্যিকার উজ্জ্বলতা সম্পর্কিত তথ্যসমৃদ্ধ সর্ববৃহৎ একক সংরক্ষণাগার ছিল এই অ্যারিসিবো।

 

পৃথিবীর সর্ববৃহৎ বেতার টেলিস্কোপের গৌরব ধারণ করে অ্যারেসিবো টেলিস্কোপ। ছবি: সংগৃহীত

পৃথিবীর সর্ববৃহৎ বেতার টেলিস্কোপের গৌরব ধারণ করে অ্যারেসিবো টেলিস্কোপ। ছবি: সংগৃহীত

 

প্রথম দুর্ঘটনা ও নিঃশেষের গল্প

গত বছরের অক্টোবরে প্রথম দুর্ঘটনা ঘটে। রিফ্লেক্টর ডিশের ওপরে ৯০০ টনের যন্ত্রাংশকে ঝুলিয়ে রাখা ১৮ টি তারের একটি তার ছিঁড়ে যায়। দ্য ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন এটি মেরামত করে নতুন তার লাগায়। ৬ নভেম্বর ছিঁড়ে যায় দ্বিতীয় আরেকটি তার। এই মেরামতের কাজ মোটেও সহজ ছিল না। ফলে, ইঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে পরামর্শ করে মানমন্দিরের কিছু অংশ ভেঙে ফেলার সিদ্বান্ত নেয়া হয়।

হুট করেই ১ ডিসেম্বর যন্ত্রাংশটি ভেঙে পড়ে। ঘটনাস্থলের ৫০০ ফিটের মধ্যেই অনেক মানুষ কাজ করছিল। তবে এই দুর্ঘটনায় কেউ মারা যায়নি। যে পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তারপর এই মানমন্দির আবার মেরামত করে সচল করে তোলার চিন্তা অবান্তর। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন (এনএসএফ) সরকারকে কথা দিয়েছে, মানমন্দির বন্ধ করে দিলে জায়গাটিকে আবার আগের মতো করেই ফিরিয়ে দেয়া হবে। 

২০১৬ সালে চীনের গুয়াংঝুতে ফাইভ-হান্ড্রেড-মিটার অ্যাপারচার স্ফেরিক্যাল টেলিস্কোপ বানানো হলে অ্যারেসিবো পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম বেতার টেলিস্কোপে পরিণত হয়।এসবকিছুর পরও অ্যারেসিবো নিজের কাজ সম্পাদন করে গেছে। ইট-পাথর-যণ্ত্রাংশের এই স্থাপনাটি হয়তো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে কিন্তু এর গুরুত্ব অমর হয়ে থাকবে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে। 

আমাদের এই পৃথিবী থেকে বহু বহু আলোকবর্ষ দূরে যদি কখনো কোনো প্রাণী অ্যারেসিবো বার্তা পায়, তবে সে জানবে না যে বার্তাপ্রেরক আর নেই। টেলিস্কোপটি ভেঙে পড়লেও নিজের চিহ্ন মহাবিশ্বে রেখে যেতে ভুল করেনি।

আলোকিত সিরাজগঞ্জ
আলোকিত সিরাজগঞ্জ